রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এ হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলো। সোমবার (২৬ অক্টোবর) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক রবিউল আলম আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। একই সঙ্গে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে আগামী ২৫ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এম. আনিছুর রহমান আনিছ আদালতের এই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতিতে রাজধানীতে প্রাণহানির যেসব ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে ট্রাকচালক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাটিও বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একজন পেশাজীবী মানুষ হিসেবে হোসেনের জীবন ও পরিবারের বাস্তবতা এ মামলার মানবিক দিককে সামনে নিয়ে এসেছে। মামলার অভিযোগ গঠন হওয়ায় এখন আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে অভিযোগ গঠন মানেই আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। বিচার শেষে সাক্ষ্য, তথ্য-প্রমাণ ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতেই আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, সোমবার মামলাটিতে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের মক্কেলদের অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানান। শুনানি শেষে আদালত সেই আবেদন নাকচ করে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। এর ফলে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারপর্বে প্রবেশ করেছে। পরবর্তী ধাপে সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে মামলার অভিযোগগুলো পরীক্ষা করা হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় গুলিতে নিহত হন ট্রাকচালক মো. হোসেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ওই ঘটনা ঘটে। সেদিন তিনি গাবতলীতে ট্রাক রেখে বাসায় ফিরছিলেন। পথে চাঁদ উদ্যান এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। কর্মজীবন শেষে বাড়ি ফেরার পথে এমন পরিণতি তাঁর পরিবারকে গভীর সংকটে ফেলে। একজন উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানোর বেদনার পাশাপাশি হত্যার ঘটনায় ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশাও পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তাঁর মা রীনা বেগম বাদী হয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। একজন মায়ের পক্ষ থেকে সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে ঘটনার বিচার চাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত এগিয়ে যায়। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক আকরামুজ্জামান আদালতে শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেই অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়েছে।
অভিযোগপত্রে যাঁদের আসামি করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এবং সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের নাম রয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানসহ আরও কয়েকজনের নাম মামলার আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে নাম থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণের বিষয়টি এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।
মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ৩৪ আসামির মধ্যে ২০ জন পলাতক রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে গত ২৬ জানুয়ারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানসহ চারজন কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া ১০ জন জামিনে রয়েছেন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের অবস্থান ও আদালতে উপস্থিতির বিষয়টি বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে কারাগারে থাকা, জামিনে থাকা কিংবা পলাতক থাকার বিষয়গুলো নিজেরাই কারও অপরাধ প্রমাণ করে না; মামলার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের।
এই মামলার বিচার শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের আন্দোলনকালীন সহিংসতার ঘটনায় দায় নির্ধারণের প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। আন্দোলনের সময় সংঘটিত প্রাণহানির ঘটনাগুলোতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করে। অন্যদিকে, বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতার জন্য তদন্তের নির্ভরযোগ্যতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন, আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ এবং আদালতের স্বাধীন সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের গুরুত্ব যতই হোক, ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রত্যেক আসামির আইনি অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য।
আদালত আগামী ২৫ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করায় মামলার পরবর্তী অগ্রগতির দিকে নজর থাকবে। সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে মামলার বাদী, প্রত্যক্ষদর্শী বা সংশ্লিষ্ট অন্য সাক্ষীদের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় নথি আদালতে উপস্থাপিত হতে পারে। তবে ঠিক কোন সাক্ষী কোন দিন সাক্ষ্য দেবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানা যায়নি। বিচারিক কার্যক্রমের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মামলার অভিযোগ, ঘটনার পরিস্থিতি এবং আসামিদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ট্রাকচালক হোসেনের পরিবারের কাছে এই বিচারপ্রক্রিয়া কেবল একটি মামলা পরিচালনার বিষয় নয়; এটি প্রিয়জন হারানোর পর ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রত্যাশার অংশ। তবে মামলার ফল কী হবে, তা আগাম নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই হবে বিচারিক নিষ্পত্তির ভিত্তি। নিহতের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার এবং অভিযুক্তদের ন্যায়সংগত বিচারের অধিকার—দুটিই আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সব মিলিয়ে মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আসামিপক্ষের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে আদালত সাক্ষ্যগ্রহণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী ২৫ নভেম্বর নির্ধারিত সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলার পরবর্তী পর্যায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এখন আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর বিচারিক মূল্যায়ন হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


