প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে সামিট এলএনজি টার্মিনালের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে আগামী ৪ নভেম্বর থেকে দেশের গ্যাস সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিতে পারে। রক্ষণাবেক্ষণ চলাকালে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাবে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)।
পেট্রোবাংলা রোববার (১ নভেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত মহেশখালীতে সামিটের এলএনজি টার্মিনালের রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এ সময় টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটবে।
বর্তমানে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম চলাকালে তা কমে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ স্বাভাবিক সরবরাহের তুলনায় প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়া যাবে। সরবরাহের এই ঘাটতির প্রভাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন মাত্রায় পড়তে পারে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকার সময় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা আগে থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে, সেসব অঞ্চলে গ্রাহকরা সাময়িকভাবে আরও কম চাপ অনুভব করতে পারেন।
গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রান্নার কাজে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারী পরিবারগুলো নির্দিষ্ট সময়ে স্বাভাবিক চাপ না পাওয়ার কারণে সমস্যায় পড়তে পারেন। অনেক এলাকায় চুলায় আগুন জ্বললেও তা প্রয়োজনীয় মাত্রায় না জ্বলতে পারে। ফলে রান্নার সময় বাড়ার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতার প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু আবাসিক গ্রাহক নয়, গ্যাসনির্ভর শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, বয়লার পরিচালনা, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য কাজে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রমেও সাময়িকভাবে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
বিশেষ করে যেসব শিল্পকারখানা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন পরিকল্পনায় সাময়িক পরিবর্তন আনতে হতে পারে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদনের গতি কমানো বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যক্রম সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে রক্ষণাবেক্ষণকাজের সময় কোন এলাকায় কী মাত্রায় প্রভাব পড়বে, তা স্থানীয় সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রাকৃতিক গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তবে রক্ষণাবেক্ষণকালীন সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে পেট্রোবাংলার বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে রিগ্যাসিফিকেশন করে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। পরে সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা হয়। ফলে টার্মিনালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলে জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
পেট্রোবাংলার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সামিট এলএনজি টার্মিনালে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। এ কারণে ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ কম থাকবে।
তবে বিজ্ঞপ্তিতে রক্ষণাবেক্ষণ শেষ হওয়ার পর গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করার বিষয়ে কোনো বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা জানানো হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হলে সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সময় গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে গত ডিসেম্বরেও একই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের কারণে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছিল। ফলে এবারও কয়েক দিনের জন্য গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি আগেভাগেই গ্রাহকদের জানিয়ে দিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণকাজের কারণে সৃষ্ট সাময়িক অসুবিধার জন্য তারা দুঃখিত।
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সময়ে ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়। শিল্প, বিদ্যুৎ, সার, আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো কারণে অতিরিক্ত ঘাটতি তৈরি হলে তার প্রভাব এক খাত থেকে অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে এলএনজি টার্মিনালগুলোর কার্যক্রম জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রক্ষণাবেক্ষণের মতো কারিগরি কার্যক্রম মূলত দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয়। টার্মিনালের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময় পর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের বাইরেও এমন কাজ করতে হয়। যদিও এর ফলে স্বল্পমেয়াদে গ্রাহকদের অসুবিধা তৈরি হতে পারে, তবে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনার জন্য এসব কাজ গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে রক্ষণাবেক্ষণ চলাকালে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় গ্রাহকদের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস ব্যবহারে সচেতন থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ৪ নভেম্বর সকাল থেকে শুরু হওয়া এই রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ৭ নভেম্বর বিকেল পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। অর্থাৎ কয়েক দিন ধরে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। ফলে এ সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে পিক আওয়ারে গ্যাসের চাপ কম অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাময়িক এই ঘাটতি কাটিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ হওয়ার পর সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে বলে প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্টরা। তবে কোনো এলাকায় কতটা চাপ কমবে বা কতক্ষণ এ পরিস্থিতি থাকবে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় চাহিদা, পাইপলাইনের চাপ এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর।
সব মিলিয়ে সামিটের এলএনজি টার্মিনালের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের কারণে আগামী কয়েক দিন দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ তৈরি হতে যাচ্ছে। আগাম সতর্কতার মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রস্তুত থাকার সুযোগ করে দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সম্পন্ন করে দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরিয়ে আনাই হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।


