প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন দেশ নাট্যগোষ্ঠীর ৩৩ বছর পূর্তি আনন্দঘন পরিবেশে উদ্যাপন করা হয়েছে। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে নাট্যচর্চা, সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবদান রেখে চলেছে সংগঠনটি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সংগঠক, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সংস্কৃতিপ্রেমীদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে সংগঠনের নিজস্ব মঞ্চ ‘দেশমঞ্চ’। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় সংস্কৃতির শক্তি, নাটকের সামাজিক ভূমিকা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় দেশ নাট্যগোষ্ঠীর ‘দেশমঞ্চে’ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন শুরু হয় সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। পরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। সবশেষে মঞ্চস্থ হয় ইম্প্রোভাইজেশন নাটক ‘টাক বদন’। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক পথচলার স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা এবং ভবিষ্যতে নাট্যচর্চাকে আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা।
দেশ নাট্যগোষ্ঠীর এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল সুর ছিল—নাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরা, মানুষের চিন্তাকে নাড়া দেওয়া এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার একটি কার্যকর শিল্পমাধ্যম। ‘নাটক হোক শৃঙ্খলিত মানুষের মুক্তির গান’ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সংগঠনটি শায়েস্তাগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমৃদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিন দশকের বেশি সময়ের এই যাত্রায় সংগঠনটি স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের একত্র করার পাশাপাশি নাট্যচর্চার মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দেশ নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি হারুন সাঁই। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক কামরুল হাসান। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আ স ম আফজাল আলী, জেলা কালচারাল অফিসার অসীত বরণ দাস গুপ্ত, জেলা জাসাসের সভাপতি মিজানুর রহমান চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক নাসরিন হক, শায়েস্তাগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মঈনুল হাসান রতন, দেশ নাট্যগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জিতু আহমেদ মাখন, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মুখলিছুর রহমান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান সুমনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাকে একটি আলোকিত, সচেতন ও মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, মানুষের জীবন ও সমাজের নানা দিককে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষমতা নাটকের রয়েছে। নাটকের কাহিনি, সংলাপ, চরিত্র ও মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে সামাজিক অসংগতি, বৈষম্য, অন্যায় এবং মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব। এর ফলে দর্শক শুধু বিনোদনই পান না, বরং নিজের চারপাশের বাস্তবতা নিয়ে ভাবার সুযোগও পান।
শায়েস্তাগঞ্জের মতো উপজেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের গুরুত্বও আলোচনায় উঠে আসে। বড় শহরের তুলনায় স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত নাট্যচর্চা, মঞ্চনাটক আয়োজন এবং শিল্পীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থাকে। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংগঠনের কার্যক্রম চালু রাখা সহজ কাজ নয়। সংগঠনের সদস্যদের সময়, শ্রম, আন্তরিকতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়েই এমন সাংস্কৃতিক পরিসর টিকে থাকে। দেশ নাট্যগোষ্ঠীর ৩৩ বছর পূর্তি সেই ধারাবাহিকতারই একটি উল্লেখযোগ্য উপলক্ষ।
নাট্যচর্চা স্থানীয় তরুণদের সৃজনশীলতা বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে। একটি নাটক প্রস্তুত করতে অভিনয়শিল্পী, নির্দেশক, নাট্যকার, মঞ্চকর্মী, আলোক ও শব্দ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিসহ অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে তরুণেরা দলগত কাজ, দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা এবং অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান। পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের জীবন সম্পর্কে তাঁদের জানার আগ্রহও বাড়তে পারে। ফলে সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমকে কেবল মঞ্চকেন্দ্রিক আয়োজন হিসেবে না দেখে সামাজিক বিকাশের একটি অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
দেশ নাট্যগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যের সংযোজন অনুষ্ঠানটিকে বহুমাত্রিক করে তোলে। এসব শিল্পমাধ্যম মানুষের অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি ভাষা, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার চর্চাকে এগিয়ে নেয়। স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ তাঁদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে এবং একই সঙ্গে দর্শকদের সঙ্গে শিল্পের একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক গড়ে তোলে। নিয়মিত এমন আয়োজনের মাধ্যমে নতুন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে আসার পথ তৈরি হতে পারে।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, দেশ নাট্যগোষ্ঠী ভবিষ্যতেও নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশীয় সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা ও সামাজিক সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। তাঁদের প্রত্যাশা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণদের সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা গেলে সমাজে ইতিবাচক চিন্তার পরিবেশ আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরার সুযোগও বাড়বে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় সংগঠনের দীর্ঘ পথচলার তাৎপর্যও বিশেষভাবে বিবেচ্য হয়ে ওঠে। ৩৩ বছর ধরে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের অস্তিত্ব বজায় থাকা মানে বিভিন্ন সময়ে নানা সীমাবদ্ধতা ও পরিবর্তনের মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। সময়ের সঙ্গে দর্শকের রুচি, বিনোদনের মাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন এলেও সরাসরি মঞ্চনাটকের আবেদন আলাদা। শিল্পী ও দর্শকের মুখোমুখি উপস্থিতি, অভিনয়ের তাৎক্ষণিকতা এবং জীবন্ত পরিবেশনা নাটককে একটি স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।
আলোচনা সভা শেষে দেশ নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি হারুন সাঁইয়ের নির্দেশনায় ইম্প্রোভাইজেশন নাটক ‘টাক বদন’ মঞ্চস্থ হয়। নাটকটির পরিবেশনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিক আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতা ও অভিনয়শিল্পীদের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ইম্প্রোভাইজেশনধর্মী পরিবেশনা দর্শকদের জন্য ভিন্ন ধরনের নাট্য-অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সাংস্কৃতিক পর্বে নাটকটির মঞ্চায়ন সংগঠনটির মূল পরিচয়—নাট্যচর্চাকে—আবারও সামনে নিয়ে আসে।
দেশ নাট্যগোষ্ঠীর ৩৩ বছর পূর্তি তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন নয়; বরং শায়েস্তাগঞ্জের সাংস্কৃতিক চর্চার ধারাবাহিকতা, স্থানীয় শিল্পীদের অবদান এবং সমাজে শিল্প-সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। একটি সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে তার নিয়মিত কার্যক্রম, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কতটা গভীর হচ্ছে তার ওপর। সেই বিবেচনায় দেশ নাট্যগোষ্ঠীর সামনে রয়েছে অর্জনকে ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য নতুন শিল্পী তৈরি, নাট্যচর্চার পরিসর সম্প্রসারণ এবং সমাজের সমসাময়িক বিষয়গুলোকে মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ।
সংস্কৃতিচর্চা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে পারে। দেশ নাট্যগোষ্ঠী আগামী দিনেও সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ চালিয়ে গেলে শায়েস্তাগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন আরও প্রাণবন্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ৩৩ বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সংগঠনটি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করবে—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্টরা।

