আমাদের সম্পর্কে

সময়ের সন্ধান: বাংলাদেশের সবচেয়ে পঠিত দৈনিকের অভূতপূর্ব যাত্রা

ভূমিকা: সময়ের স্রোতে এক অমর সঙ্গী

সময়, এই অদম্য প্রবাহ যা কখনো থামে না, কখনো ফিরে আসে না। এই সময়ের স্রোতে যারা সঙ্গী হয়ে ওঠে, তারাই মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার আকাশে এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র উদিত হয়েছে ২০১২ সালে—দৈনিক ‘সময়ের সন্ধান’। এই পত্রিকা শুধু খবরের পত্রপত্রিকা নয়, এটি একটি জাতির আয়না, এক সমাজের কণ্ঠস্বর এবং একদিকে মানুষের আশা-ভয়ের প্রতিফলন। ‘সময়ের সন্ধান’ নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার মিশন: এটি আমাদের সময়, আমাদের গল্প, আমাদের স্বপ্নের পত্রিকা।

জাতীয় গণমাধ্যম জরিপ ২০২১ (ক্যান্টার এমআরবি) অনুসারে, প্রতিদিন ৫ লাখেরও বেশি মানুষ এই পত্রিকা পড়েন, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পঠিত দৈনিক হিসেবে এর অবিসংবাদী স্থান নিশ্চিত করেছে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাতির বিশ্বাসের পরিচয়। ‘সময়ের সন্ধান’ যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। নিয়মিত ১২ পৃষ্ঠায় ব্রডশিট আকারে, বাদামি নিউজপ্রিন্ট কাগজে, চার রঙে মুদ্রিত এই পত্রিকা সপ্তাহে একদিন ‘সন্ধানের ডানা’ নামক সাপ্তাহিক সংযোজন নিয়ে পাঠকের দরজায় দরজায় পৌঁছে যায়। এটি শুধু খবর দেয় না, সমাজকে প্রশ্ন করে, চিন্তা জাগায় এবং পরিবর্তনের পথ দেখায়।

এই নিবন্ধে আমরা ‘সময়ের সন্ধান’-এর যাত্রা, তার মিশন, সম্পাদকীয় দল, পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এটি শুধু একটি পত্রিকার গল্প নয়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক অধ্যায়। আসুন, সময়ের এই স্রোতে ডুব দিয়ে দেখি, কীভাবে একটি পত্রিকা জাতির হৃদয় জয় করেছে।

প্রতিষ্ঠাতা এবং যাত্রার শুরু: মোঃ মাহদিন চৌধুরী খানের দৃষ্টিভঙ্গি

‘সময়ের সন্ধান’-এর জন্ম ২০১২ সালে। এই বছর বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সম্পাদক মোঃ মাহদিন চৌধুরী, যিনি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক বিশিষ্ট নাম। খান সাহেবের নেতৃত্বে এই পত্রিকা শুরু হয় একটি সাধারণ অফিস থেকে, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অসাধারণ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সংবাদপত্র শুধু খবরের সংগ্রহ নয়, এটি সমাজের দায়িত্বশীল অংশ। “সময়ের সন্ধান মানে আমাদের সকলের সময়ের খোঁজ,” বলেছিলেন তিনি প্রথম প্রকাশনায়। এই কথা আজও পত্রিকার মন্ত্র।

মোঃ মাহদিন চৌধুরী  জীবনী নিজেই এক সাংবাদিকতার উদাহরণ। ১৯৭০-এর দশকে সাংবাদিকতায় প্রবেশকারী তিনি, বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’-এর সম্পাদক হিসেবে পরিচিত হন। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল একটি নতুন পত্রিকা, যা সাধারণ মানুষের কথা বলবে। ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি, ঢাকা থেকে প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেই দিনের ফ্রন্ট পেজে ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক বিশ্লেষণ, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে। প্রথম বছরেই এটি ১ লাখ কপি বিক্রি করে, যা তৎকালীন সময়ে এক রেকর্ড।

প্রতিষ্ঠার পিছনে ছিল একটি দল। খান সাহেবের সঙ্গে যোগ দেন অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা যেমন মাহবুবুর রহমান, ফজলে হাসান এবং অন্যান্য। তারা একসঙ্গে বসে পত্রিকার নীতি তৈরি করেন: সত্যতা, নিরপেক্ষতা এবং পাঠককেন্দ্রিকতা।

মিশন এবং দর্শন: সমাজের আয়না হিসেবে ‘সময়ের সন্ধান’

‘সময়ের সন্ধান’-এর মিশন স্পষ্ট: সাধারণ মানুষের গল্প বলা। এটি শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতির খবর নয়, গ্রামের একজন কৃষকের সংগ্রাম থেকে শহরের এক যুবকের স্বপ্ন পর্যন্ত কভার করে। পত্রিকার দর্শন হলো ‘সত্যের পক্ষে, সমাজের পাশে’। এই দর্শন অনুসরণ করে এটি বিভিন্ন ক্যাম্পেইন চালিয়েছে।

পত্রিকার নিরপেক্ষতা তার সবচেয়ে বড় শক্তি। রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করলেও, এটি কখনো পক্ষপাত করে না। ২০২০ সালের নির্বাচনে এর নিরপেক্ষ প্রতিবেদন জাতীয়ভাবে প্রশংসিত হয়। জাতীয় গণমাধ্যম জরিপে দেখা গেছে, পাঠকরা এটিকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বলে মনে করেন ৮৫% ক্ষেত্রে। এছাড়া, পত্রিকার লাইফস্টাইল সেকশন, যা স্বাস্থ্য, ফ্যাশন এবং পরিবারের টিপস দেয়, পাঠকদের দৈনন্দিন জীবনকে সমৃদ্ধ করে। ‘সন্ধানের ডানা’ সাপ্তাহিকে সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং বিশ্লেষণ থাকে, যা বুদ্ধিজীবীদের প্রিয়।

এই মিশনের পিছনে আছে একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় নীতি। পত্রিকা ফ্যাক্ট-চেকিং-এর উপর জোর দেয়। ২০১৮ সাল থেকে একটি ডিডিকেটেড টিম ফেক নিউজের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ফলে, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য সোর্স হিসেবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিকভাবে, এর প্রতিবেদন সিএনএন এবং বিবিসির মতো মিডিয়ায় ফিচার হয়েছে।

সম্পাদকীয় দল: সাংবাদিকতার অগ্রদূত

প্রসিদ্ধ সাংবাদিকরা যেমন শেখ মাহসিন, যিনি পরিবেশ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, এবং রিমা ইসলাম, যিনি নারী অধিকারের উপর লেখেন। তরুণ সাংবাদিকদের জন্য ট্রেনিং প্রোগ্রাম আছে, যা বছরে ২০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়। এই দলের কারণেই পত্রিকা পুরস্কার জিতেছে—২০১৯-এ এশিয়ান মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডসে ‘বেস্ট ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট’।

দলের কাজের ধরন অনন্য। প্রতিদিন সকালে এডিটোরিয়াল মিটিং হয়, যেখানে পাঠকের ফিডব্যাক নেওয়া হয়। ডিজিটাল টুলস যেমন এআই-ভিত্তিক অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে খবরের ট্রেন্ড ধরা হয়। এই দলই পত্রিকাকে জীবন্ত করে তোলে।

পাঠক এবং প্রভাব: ১ লাখের হৃদয় জয়

পাঠকরাই ‘সময়ের সন্ধান’-এর প্রাণ। গ্রাম থেকে শহর, যুবক থেকে বয়স্ক—সবাই এর পাঠক। জরিপে দেখা গেছে, ৬০% পাঠক ১৮-৩৫ বছরের, যা ডিজিটাল সংস্করণের জন্য আদর্শ। অনলাইন পোর্টাল samayersondhan.com-এ দৈনিক ১ লাখ ভিজিটর।

পত্রিকার প্রভাব সমাজে গভীর। ২০১৭-এর ‘ভুপাল’ কেলেঙ্কারি প্রকাশ করে এটি সরকারি তদন্ত ঘটায়। কোভিড-১৯-এ ‘স্বাস্থ্য সচেতনতা’ ক্যাম্পেইন লক্ষাধিককে সাহায্য করে। পাঠকের চিঠি এবং ফিডব্যাক পত্রিকার অংশ—’পাঠকের কথা’ কলামে প্রকাশ হয়। এটি একটি দ্বিমুখী সম্পর্ক।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন: নতুন যুগের প্রস্তুতি

২০২৫ সালে ‘সময়ের সন্ধান’ এআই এবং ভার্চুয়াল রিয়ালিটি চালু করছে। ভবিষ্যতে আরও আঞ্চলিক সংস্করণ এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের পরিকল্পনা। এটি শুধু পত্রিকা নয়, একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম।

উপসংহার: সময়ের সঙ্গী, চিরকালের জন্য

‘সময়ের সন্ধান’ আমাদের সময়ের অংশ। এর যাত্রা অনুপ্রেরণা। আসুন, এর সঙ্গে চলি, সময়কে গড়ি।