প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
এক পলকের অসাবধানতা আর ক্ষণিকের অসচেতনতা যে কতটা গভীর ও মর্মান্তিক স্বজনহারানোর বেদনায় একটি পরিবারকে ভাসিয়ে দিতে পারে, তারই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায়। প্রতিদিনের মতো সকালে নিজেদের ছোট্ট উঠানে খেলাধুলা করছিল নিষ্পাপ শিশু তাবাসছুম। অথচ কারোর অলক্ষ্যে মুহূর্তের অসাবধানতায় পাশের বৌলাই নদীর উথালপাথাল স্রোত আর শীতল পানি তাকে চিরতরে কেড়ে নিল। মাত্র দেড় বছর বয়সেই ছোট্ট এই দেবশিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ায় পুরো শরীয়তপুর গ্রামজুড়ে এখন শুধুই শোকের মাতম আর স্বজনদের আর্তনাদ। এক চিলতে হাসি আর অবুঝ চপলতায় যে শিশুটি পুরো ঘর মুখরিত করে রাখতো, তার এই আকস্মিক ও করুণ বিদায় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নিহতের পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশীরা।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত তথ্যে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত শরীয়তপুর গ্রামের অতি সাধারণ এক কৃষি শ্রমিক লিটন মিয়ার কনিষ্ঠ কন্যা ছিল দেড় বছর বয়সী শিশু তাবাসছুম। বৃহস্পতিবার সকালে পলিমাটিতে ঘেরা গ্রামীণ জীবনের আর দশটি সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল তাদের দিনটি। সকাল আনুমানিক সাড়ে সাতটার দিকে অবুঝ তাবাসছুম নিজেদের কাঁচা বসতঘরের উঠানে নিশ্চিন্ত মনে একা একা খেলাধুলা করছিল। মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যার যার দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ ও কৃষিকাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু বাড়িটির ঠিক পেছনেই থৈ থৈ করছিল প্রাক-শরতের কানায় কানায় ভরা চঞ্চল বৌলাই নদী। উঠানে খেলতে খেলতেই কোনো এক ফাঁকে অবুঝ শিশুটি হেঁটে হেঁটে ঘরের পেছনে চলে যায় এবং পা পিছলে বা অসাবধানতাবশত খরস্রোতা বৌলাই নদীর জলে পড়ে তলিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর স্বজনরা যখন উঠানে ছোট্ট তাবাসছুমকে দেখতে না পান, তখন তাদের মনে চরম আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হতে থাকে। মেয়েকে দেখতে না পেয়ে মা-বাবা ও স্বজনরা চারদিকে আতঙ্কিত হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। প্রতিবেশীদের ডেকে এনে পাড়ার গলি, আশপাশের প্রতিটি বাড়ি এবং ঝোপঝাড়সহ নানা সম্ভাব্য স্থানে উদগ্রীব হয়ে সন্ধান চালানো হয়। কিন্তু শিশুটির কোনো হদিস মিলছিল না। সময় যত গড়াচ্ছিল, পরিবারের সদস্যদের বুকের ভেতর জমে থাকা আশঙ্কা ততটাই বাস্তবে রূপ নিচ্ছিল। জল ঘেরা হাওরাঞ্চলের বসতবাড়ির পেছনের নদীটিই যে অবুঝ শিশুটিকে গিলে খেয়েছে, সেই নিদারুণ সত্যটি যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সবার চোখে। অবশেষে সকাল দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার ব্যাকুল খোঁজাখুঁজির পর সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে বসতঘরের পেছনের বৌলাই নদীর পানিতে শিশুটির নিস্পন্দ দেহ ভেসে উঠতে দেখেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
স্থায়ী বাসিন্দারা দ্রুত নদী থেকে অচেতন অবস্থায় শিশু তাবাসছুমকে উদ্ধার করে ডাঙ্গায় নিয়ে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; সুরমার শাখা বৌলাই নদীর অবাধ্য জলপ্রবাহ দেড় বছরের শিশুটির কোমল প্রাণবায়ু চিরতরে কেড়ে নিয়েছে। উদ্ধারকারীরা যখন পরীক্ষা করেন, ততক্ষণে তার দেহ অলস ও নিস্পন্দ হয়ে পড়ে ছিল। এমন মর্মান্তিক দৃশ্যে নদীর পাড়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনরা। একজন দিনমজুর বাবার অতি কষ্টে গড়ে তোলা সংসারের আনন্দ ও আলো এক মুহূর্তে নিভে যাওয়ার দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত পাড়া-প্রতিবেশীরাও। শান্ত ও নিভৃত গ্রামটিতে মুহূর্তের মধ্যে নেমে আসে এক গাঢ় বিষাদের ছায়া।
মর্মান্তিক এই পথ দুর্ঘটনার পর স্থানীয় মেম্বার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্থানীয় থানায় অবহিত করেন। খবর পেয়ে ধর্মপাশা থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ধর্মপাশা থানার উপপরিদর্শক বা এসআই মজিবুর রহমান শিশুটির মৃত্যুর খবরের নিদারুণ সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান যে, দেড় বছর বয়সী শিশু তাবাসছুমের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাটি একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহাল পরিচালনা করেছে। তদন্তে ও স্থানীয়দের বক্তব্যে এটি পরিষ্কার যে, এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় শিশুটির পরিবার বা অন্য কারও কোনো প্রকার সন্দেহ বা লিখিত অভিযোগ নেই।
অভিযোগ না থাকায় এবং স্বজনদের আকুল আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিহতের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই বিনা ময়নাতদন্তে দাফনের অনুমতি প্রদান করা হয়। পুলিশ কর্মকর্তা এসআই মজিবুর রহমান আরও যোগ করেন যে, ময়নাতদন্তের ঝক্কিঝামেলা এড়িয়ে পরিবারের কাছে নিথর দেহটি হস্তান্তর করা হয়েছে, যাতে তারা ধর্মীয় রীতি ও সামাজিক অনুশাসন মেনে শিশুটিকে শেষ বিদায় জানাতে পারেন। এই করুণ ঘটনার পর পুরো ইউনিয়নের প্রতিটি পরিবারে নেমে এসেছে এক ধরনের সচেতনতামূলক শোক। গ্রামীণ জনপদে, বিশেষ করে নদী ও হাওরবেষ্টিত অঞ্চলে শিশুসন্তানদের নিরাপত্তার বিষয়ে অভিভাবকদের কতটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন, এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি যেন আরও একবার জলজ্যান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে নিয়ে এলো।
হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের গ্রামগুলোতে ঘরের ঠিক পেছনেই নদী বা বড় জলাশয় থাকা অত্যন্ত সাধারণ একটি চিত্র। বর্ষা ও পরবর্তী সময়ে এই নদীগুলো পানিতে থইথই করে। ফলে একটুখানি চোখের আড়াল হলেই অবুঝ শিশুরা যে কোনো মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকিতে পড়ে যায়। স্থানীয় প্রবীণ ও সচেতন মানুষরা মনে করছেন, গ্রামীণ এলাকায় কাজের শত ব্যস্ততার মাঝেও ছোট শিশুদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো ছাড়া এ ধরনের মর্মস্পর্শী দুর্ঘটনা এড়ানোর আর কোনো বিকল্প নেই। এক মুহূর্তে বৌলাই নদীর জলে ভেসে যাওয়া দেড় বছরের শিশু তাবাসছুমের অকাল প্রস্থান তাই শুধু একটি পরিবারের বুক খালিই করেনি, বরং পুরো গ্রামের আকাশ- বাতাসকে এক ভারী দীর্ঘশ্বাসে ভরিয়ে দিয়েছে।


