প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। আগামী শনিবার (২৪ অক্টোবর) সম্ভাব্য বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করা হবে। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ কমাতে সেনাবাহিনীর সেন্তিনেল বাহিনীকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। গত শনিবারের বিক্ষোভে দেশের বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এখন আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেন্তিনেল বাহিনীর সদস্যরা নির্দিষ্ট নিরাপত্তামূলক দায়িত্ব পালন করবেন, যাতে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী জেন্ডার্মস সদস্যরা সরাসরি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। তবে সেনা মোতায়েনের অর্থ বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনীকে সরাসরি পুলিশের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা নয়; বরং নিরাপত্তার কিছু দায়িত্ব সেনাদের হাতে দিয়ে পুলিশি তৎপরতা আরও কার্যকর করাই এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নুও আগামী শনিবারের কর্মসূচিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। জাতীয় পরিষদে তিনি বলেন, আগের বিক্ষোভে যেসব দুর্বলতা দেখা গেছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এবার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য বিক্ষোভের সময় পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করা হবে। সরকারের লক্ষ্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সুযোগ বজায় রেখেও সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো ঘটনা প্রতিরোধ করা।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মানুষের অসন্তোষের মধ্যেই সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে শুরু হওয়া কর্মসূচির একপর্যায়ে কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, কট্টর বামপন্থি কিছু গোষ্ঠী বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে সহিংসতা উসকে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকোর্নু জাতীয় পরিষদে বলেন, কিছু গোষ্ঠী পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সবাইকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার সুযোগ নেই। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারী, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তি এবং সুযোগসন্ধানী লুটেরাদের মধ্যে পার্থক্য করা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের সরকারি কার্যালয় এলিসি প্রাসাদ কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন অভিমুখে সহিংস উদ্দেশ্যে কোনো মিছিল পরিচালিত হতে দেওয়া হবে না। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হচ্ছে। বিক্ষোভের সময় কোথাও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত বাহিনী পাঠানো, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
গত শনিবারের সহিংসতায় ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের হিসাব অনুযায়ী, শহরটিতে পাঁচ শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানপাটে ভাঙচুর, লুটপাট এবং বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার কারণে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব পড়েছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এমন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। দোকান বন্ধ রাখা, পণ্য হারানো এবং সম্পত্তির ক্ষতি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
মার্সেইয়ে সহিংসতার ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। এ তথ্যকে কেন্দ্র করে তরুণদের বিক্ষোভে অংশগ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সহিংসতার দায় নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া মানেই প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হওয়ার কথা।
গত শনিবারের সংঘর্ষে সারাদেশে ১১৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ ইউনিয়নের কর্মকর্তা আর্নড ব্লেস পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে সহিংসতার মাত্রাকে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কট্টর বামপন্থি ‘ব্ল্যাক ব্লক’ গোষ্ঠীর সদস্যরা বিক্ষোভের মধ্যে উসকানি দিয়েছেন এবং পরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে বিপুলসংখ্যক টিয়ার গ্যাসের শেল ব্যবহার করতে হয়েছিল বলে তিনি জানান। একপর্যায়ে গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কিছু এলাকায় পুলিশকে পিছু হটতে হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন; ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে তদন্তের ফলও গুরুত্বপূর্ণ।
সহিংসতার পর সোমবার মার্সেই সফর করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ। সেখানে তিনি শহরটির মেয়র বেনোয়া পায়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। মেয়র সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, সংকট মোকাবিলায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা ছিল। তাঁর মতে, পুলিশের সদস্যসংখ্যা, বাহিনী মোতায়েনের ধরন এবং দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। শুধু শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে অভিযান চালালে ভবিষ্যতে লুটপাট ও সহিংসতার ঝুঁকি থেকেই যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
মার্সেইয়ের পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, সহিংস বিক্ষোভের প্রভাব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর পড়ে না; স্থানীয় ব্যবসায়ী, কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ বাসিন্দারাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। সংঘর্ষের কারণে পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হলে দৈনন্দিন জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আবার অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের সময় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের অধিকার রক্ষা এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
এদিকে ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার তিনি প্যারিস ভবিষ্যতে একটি ‘মুসলিম শহরে’ পরিণত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য ফ্রান্সে অভিবাসন নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এ মন্তব্যকে ইউরোপে অভিবাসন নীতি নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সমালোচনার ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভকে কেবল অভিবাসন প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করলে সংকটের অন্যান্য কারণ আড়ালে থেকে যেতে পারে। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপ, সরকারি সেবার মান, তরুণদের অসন্তোষ, রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় এসেছে। ফলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলোও যথাযথভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
আগামী শনিবারের কর্মসূচি ফ্রান্স সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। সরকার একদিকে সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার বজায় রাখার দায়িত্বও রয়েছে। সেন্তিনেল বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় পুলিশের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের সমন্বয়, পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম তথ্য, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আইনানুগ পদক্ষেপের ওপর। একই সঙ্গে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। ফ্রান্সের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামাজিক অসন্তোষের কারণগুলো চিহ্নিত করে পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করা।


