প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠেয় তাফসিরুল কোরআন মাহফিল শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। পুলিশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় উপজেলা প্রশাসন মাহফিল আয়োজনের অনুমতি দেয়নি। ফলে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, অতিথিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং বড় পরিসরে প্যান্ডেল নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠানটি আর অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রশাসনের মৌখিক নির্দেশনার পর আয়োজকেরা প্যান্ডেল গুটিয়ে নেন এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের অনুষ্ঠানে না আসার অনুরোধ জানান।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেল থেকে গোদাগাড়ী মহিলা কলেজ মাঠে এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণে বড় পরিসরে অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন উদ্যোক্তারা। মাহফিলকে কেন্দ্র করে গোদাগাড়ীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার-প্রচারণাও চালানো হয়। তবে নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলেও প্রশাসনিক অনুমতি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আয়োজনটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহফিলের প্রস্তুতি অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। মাঠে প্যান্ডেল নির্মাণের কাজ চলছিল এবং অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল দেশের পরিচিত কয়েকজন ধর্মীয় বক্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের। কিন্তু পুলিশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রতিবেদন না আসায় অনুমতির বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে প্রশাসনের মৌখিক নির্দেশনা পাওয়ার পর পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে সরে আসেন তাঁরা।
‘মানব কল্যাণ পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন এ তাফসিরুল কোরআন মাহফিলের আয়োজন করেছিল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল রেলবাজার দারুস সুন্নাহ ইসলামিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবু মুহাম্মদ বজলুর রহমান মাদানীর। প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমানকে। পাশাপাশি প্রধান আলোচক হিসেবে পোস্টার ও ব্যানারে নাম উল্লেখ করা হয়েছিল সংসদ সদস্য ও ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজার। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে সম্মতিও দিয়েছিলেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। স্থানীয় জামায়াত নেতা ওবায়দুল্লাহকেও অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
মাহফিল আয়োজনের অনুমতি চেয়ে গত ১৩ অক্টোবর গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর আবেদন করেন আয়োজকেরা। তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে প্রশাসনিক অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু অনুমতির প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় আয়োজনের শেষ পর্যায়ে এসে জটিলতা দেখা দেয়।
মানব কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ইসমাইল হক জানান, গত শনিবার সকালে তাঁরা অনুমতির বিষয়ে কথা বলতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় ইউএনও তাঁদের জানান, মাহফিলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রতিবেদনের জন্য পুলিশের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। পুলিশ প্রতিবেদন না দেওয়া পর্যন্ত অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয় বলেও তাঁদের জানানো হয়।
ইসমাইল হকের বক্তব্য অনুযায়ী, এ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে মাহফিল আয়োজন করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে না ধরে নিয়ে আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁদের আসতে নিষেধ করার পাশাপাশি আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে মাঠে নির্মাণাধীন প্যান্ডেল গুটিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন আয়োজকেরা।
আয়োজকদের জন্য শেষ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। কারণ, একটি বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে মাঠ প্রস্তুত করা, প্যান্ডেল নির্মাণ, অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রচার-প্রচারণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্যও প্রস্তুতি নিতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি না থাকায় তাঁরা অনুষ্ঠানটি চালিয়ে যাওয়ার পথে এগোতে পারেননি।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান জানান, পুলিশের ছাড়পত্র ছাড়া এত বড় জনসমাগমের অনুমতি দেওয়ার নিয়ম নেই। নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে এবং সেটি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রশাসনের বক্তব্যে মূলত জনসমাগমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাবেশ কিংবা জনসম্পৃক্ত কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপস্থিতির সংখ্যা, মাঠের অবস্থা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, যানবাহন চলাচল এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ ধরনের আয়োজনের অনুমতি দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতে পারে। তবে গোদাগাড়ীর এই মাহফিলের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রতিবেদনে কী বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার মো. মামুন অর রশিদ জানান, মাহফিল স্থগিতের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। উপজেলা বা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে কোনো প্রতিবেদন চাওয়া হয়ে থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ওই আয়োজনের অনুমতিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট থানার কাছে কোনো প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল কি না, সেটি যাচাই করা হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে। এ বিষয়ে পুলিশের প্রতিবেদন চাওয়ার পর সেটি কেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওয়া যায়নি, কিংবা প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে ছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
ঘটনাটি ঘিরে প্রশাসনিক অনুমতি এবং জনসমাগমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একদিকে আয়োজকেরা একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, অন্যদিকে প্রশাসন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত ছাড়পত্র ছাড়া বড় জনসমাগমের অনুমতি দিতে রাজি হয়নি। দুই পক্ষের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, অনুমতির বিষয়টি মূলত পুলিশি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করেই আটকে যায়। তবে এ ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
ধর্মীয় মাহফিল বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পরিচিত অংশ। এসব অনুষ্ঠানে কোরআনের তাফসির, ধর্মীয় আলোচনা এবং নৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে বক্তব্য শোনার জন্য বিভিন্ন বয়সী মানুষ সমবেত হন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের আয়োজন মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করতেও ভূমিকা রাখে। ফলে একটি নির্ধারিত মাহফিল স্থগিত হলে আয়োজক ও অংশগ্রহণে আগ্রহী মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের জন্য শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন অসুবিধার কারণ হতে পারে।
তবে জনসমাগমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে আগাম পরিকল্পনা, অনুমোদনের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে আয়োজক ও প্রশাসন—উভয় পক্ষের জন্যই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। এ কারণে অনুষ্ঠান আয়োজনের আবেদন করার পর অনুমতির অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে আগেই নির্দেশনা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
গোদাগাড়ীর এ মাহফিলের ক্ষেত্রে আয়োজকেরা গত ১৩ অক্টোবর অনুমতির আবেদন করেছিলেন বলে জানিয়েছেন। এরপর শনিবার ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় পুলিশি প্রতিবেদন না আসার বিষয়টি তাঁদের জানানো হয়। সোমবার অনুষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও অনুমতির অনিশ্চয়তা দূর না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়। ঘটনাক্রমে দেখা যাচ্ছে, আয়োজনের প্রস্তুতি চললেও চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদন না পাওয়ায় অনুষ্ঠানটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
এখন পর্যন্ত মাহফিলটি পুনরায় আয়োজনের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। ভবিষ্যতে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হলে নতুন করে অনুমতি নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে আয়োজকদের পক্ষ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে উপস্থিত হতে আগ্রহী ব্যক্তিরা নতুন সময়সূচি সম্পর্কে জানতে পারবেন।
সব মিলিয়ে, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মুফতি আমির হামজার অংশগ্রহণে পরিকল্পিত তাফসিরুল কোরআন মাহফিলটি পুলিশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতায় স্থগিত হয়েছে। আয়োজকেরা প্রস্তুতি নিয়েও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান করতে পারেননি, আর প্রশাসন জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় পুলিশি ছাড়পত্র ছাড়া বড় জনসমাগমের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে মাহফিলটি ভবিষ্যতে নতুন করে আয়োজন করা হবে কি না।


