প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জে পারিবারিক কলহের জেরে ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মাকে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁরই বড় ছেলে নুরু আলমের বিরুদ্ধে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের কাইয়ারগাঁও মধ্যপাড়া গ্রামে নিজ বসতঘরে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর স্থানীয়দের সহযোগিতায় অভিযুক্ত ছেলেকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত রেজিয়া খাতুনের এমন করুণ মৃত্যুতে এলাকায় শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে মা-ছেলের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল, তা এখনো বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত রেজিয়া খাতুনের বয়স ছিল ৭০ বছর। তিনি কাইয়ারগাঁও মধ্যপাড়া গ্রামের মৃত হাসান উদ্দিনের স্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই এলাকায় বসবাস করছিলেন। শুক্রবার ভোর আনুমানিক পাঁচটার দিকে তাঁর টিনের বসতঘরে পারিবারিক বিষয় নিয়ে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে সেই বাকবিতণ্ডা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ থাকলেও তা কীভাবে এমন প্রাণঘাতী ঘটনায় পরিণত হলো, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে বাড়ির ভেতরে মা ও ছেলের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে রেজিয়া খাতুনের বড় ছেলে নুরু আলম (৪৫) ধারালো দা দিয়ে তাঁর মায়ের গলার পেছনে আঘাত করেন। গুরুতর আঘাতের কারণে রেজিয়া খাতুন রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়ে যান। পরে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে ঘটনার প্রতিটি পর্যায়, হামলার সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং এতে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একটি পরিবারের ভেতরে এমন সহিংস ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের লোকজনের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মা ও ছেলের সম্পর্ক সাধারণত স্নেহ, নির্ভরতা এবং পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও সেই সম্পর্কের মধ্যেই এমন প্রাণঘাতী ঘটনা সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বিশেষ করে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে একজন বৃদ্ধাকে নিজের বসতঘরে এমন পরিণতির শিকার হতে হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে ঘটনাটির পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ বা পারিবারিক বিরোধের ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত অনুমাননির্ভর বক্তব্য দেওয়া সমীচীন নয়।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত নুরু আলমকে আটক করে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁকে আটক করা সম্ভব হয় বলে জানা গেছে। এরপর পুলিশ নিহত রেজিয়া খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করে। ঘটনাস্থলে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা সম্ভাব্য আলামত তদন্তের পরবর্তী ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, আলামত সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করতে শুধু প্রাথমিক অভিযোগের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। ঘটনার আগে কী ঘটেছিল, বিরোধের সূত্রপাত কোথায়, হামলার সময় পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা কী—এসব বিষয় প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ জানিয়েছেন, ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের এই বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি উদ্ঘাটন এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এ ঘটনার আইনগত নিষ্পত্তি হওয়ার কথা।
এদিকে বৃদ্ধা রেজিয়া খাতুনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পারিবারিক বিরোধ কীভাবে সহিংসতায় রূপ নিল, ঘটনার আগে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা বিরোধ চলছিল কি না এবং প্রতিবেশীরা এ বিষয়ে কিছু জানতেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসতে পারে। তবে এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
পরিবারের ভেতরে মতবিরোধ বা দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিরোধ যখন হুমকি, আঘাত কিংবা প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তার পরিণতি শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো পরিবার ও আশপাশের মানুষের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের নিরাপত্তা, পারিবারিক নির্ভরতা এবং সংকটের সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি এ ধরনের ঘটনায় নতুন করে সামনে আসে। তবে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রকৃত কারণ না জেনে বৃহত্তর কোনো সামাজিক ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পর্যবেক্ষণে পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতার গুরুত্ব রয়েছে। বিরোধ গুরুতর হলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিশ্বস্ত স্বজন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়াও পরিস্থিতি সামাল দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া জরুরি। কোনো বিরোধই কারও জীবন কেড়ে নেওয়ার বৈধতা তৈরি করতে পারে না।
কাইয়ারগাঁও মধ্যপাড়ার এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তির ভূমিকা যাচাই করা। ময়নাতদন্তের ফলাফল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
একজন প্রবীণ নারীর এমন মৃত্যু স্থানীয় সমাজে যে শোক ও অস্বস্তি তৈরি করেছে, তা সহজে কাটিয়ে ওঠা কঠিন। তবে আবেগের পাশাপাশি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অপরিহার্য। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি উদ্ঘাটন এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই এই মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু নিষ্পত্তির পথ তৈরি হতে পারে। সুনামগঞ্জের কাইয়ারগাঁও মধ্যপাড়ায় ৭০ বছর বয়সী রেজিয়া খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবার নজর পুলিশের তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের দিকে।


