প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে প্রবাসীর স্ত্রী শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্না হত্যা মামলায় জিতেশ চন্দ্র গোপ নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া মরদেহ গুমের চেষ্টার অপরাধে তাঁকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের এ রায়ের মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের বিচারিক কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শেষ হলো। মামলার নথি অনুযায়ী, জগন্নাথপুরে বসবাসরত প্রবাসীর স্ত্রী শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্না ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় জিতেশ চন্দ্র গোপের বিরুদ্ধে হত্যা এবং অপরাধের আলামত গোপনের অভিযোগে মামলা করা হয়। তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে পৃথক অপরাধে এ দণ্ড দেন।
আদালতের আদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন ছাড়া এ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না। অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারাগারের নির্ধারিত সেলে রাখার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দণ্ডিত জিতেশ চন্দ্র গোপের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলায়। তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের একটি মার্কেটে অবস্থান করতেন। তবে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে তাঁর কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ, হত্যার উদ্দেশ্য কিংবা ঘটনার সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে সরবরাহ করা তথ্যে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর বিচারক আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন। হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি মরদেহ গুমের চেষ্টার অপরাধে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুই অপরাধে জরিমানার পরিমাণও পৃথকভাবে নির্ধারণ করেছেন আদালত। হত্যা মামলায় এক লাখ টাকা এবং মরদেহ গুমের চেষ্টার অপরাধে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মল্লিক মঈন উদ্দিন সুহেল। তিনি বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের রায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
তবে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাপ। নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় না। সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে। ফলে সুনামগঞ্জের এ মামলায় পরবর্তী আইনি কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তি নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা, বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা এবং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে কোনো পরিবারের সদস্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে স্বজনদের জন্য বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। এ ধরনের মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন এবং আদালতের স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জগন্নাথপুরের এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তবে মামলার বিস্তারিত সাক্ষ্য, তদন্তে পাওয়া সব তথ্য এবং বিচারকের পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ সরবরাহ করা বিবরণে নেই। তাই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ বা ঘটনার প্রতিটি দিক নিয়ে অতিরিক্ত কোনো দাবি করা সমীচীন নয়।
আইনের দৃষ্টিতে অপরাধের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালতের রায় ও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়াই প্রধান। এ মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পর হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদনসহ পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে রায়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কোনো আপিল বা অন্য বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে মামলার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণে তা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এ রায় জগন্নাথপুরে প্রবাসীর স্ত্রী শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্না হত্যা মামলার বিচারিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এখন মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে উচ্চ আদালতের অনুমোদন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে নজর থাকবে। ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার যে প্রত্যাশা নিয়ে বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে, তার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হবে আইনসম্মত সব ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর।


