প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের বালাগঞ্জে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের মামলায় সুমেল খাঁ (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁকে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সিলেট জেলা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ রুবাইয়া ইয়াসমিন এ রায় ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোস্তাক আহমদ রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ শেষে আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন। মামলাটি প্রায় ১৯ বছর আগের একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা শিশুর নিরাপত্তা, অপরাধের বিচার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বকে সামনে এনেছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত সুমেল খাঁ বালাগঞ্জ উপজেলার গোপক গ্রামের তইমুজ খাঁর ছেলে। আদালতের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে এ সাজা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারি কৌঁসুলি।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ৫ নভেম্বর রাতে বালাগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ১৩ নম্বর মহিলা ওয়ার্ডে ১০ বছর বয়সী শিশুটিকে ধর্ষণ করেন সুমেল খাঁ। পরদিন শিশুটির চাচা বাদী হয়ে বালাগঞ্জ থানায় মামলা করেন। এরপর শুরু হয় মামলার আইনগত প্রক্রিয়া।
ঘটনাটি হাসপাতালের মতো একটি চিকিৎসাসেবাকেন্দ্রে ঘটেছিল বলে মামলাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। হাসপাতাল সাধারণত অসুস্থ মানুষ ও তাঁদের স্বজনদের আশ্রয় এবং চিকিৎসার জায়গা। সেখানে শিশু ও নারীসহ সেবাগ্রহীতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ, দায়িত্বশীল তদারকি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার আদালত রায় ঘোষণা করেন। সরকারি কৌঁসুলি মোস্তাক আহমদ বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত সুমেল খাঁকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে জরিমানার অর্থ কীভাবে আদায় করা হবে কিংবা তা ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা রয়েছে কি না, সে সম্পর্কে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে শিশুর নিরাপত্তাবোধ, স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং মানসিক সুস্থতার ওপর পড়তে পারে। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ায় শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগ গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব মামলায় অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং আদালতে উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে বিচারিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোনো মামলায় সাজা ঘোষণার ক্ষেত্রে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়ের সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। বালাগঞ্জের এ মামলায় আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন সরকারি কৌঁসুলি।
প্রায় দুই দশক আগের ঘটনার বিচারিক নিষ্পত্তি ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চলার বিষয়টি বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নিয়েও প্রশ্ন সামনে আনে। তবে এ মামলায় তদন্ত, বিচার চলাকালে বিলম্বের নির্দিষ্ট কারণ কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিলম্বের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করার সুযোগ নেই।
শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে। কোনো শিশু ঝুঁকিতে পড়লে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশেষ করে হাসপাতাল ও অন্যান্য জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সচেতনতা এবং কার্যকর তদারকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ধরনের মামলায় ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করাও অপরিহার্য। শিশুর পরিচয় প্রকাশ করে এমন তথ্য প্রচার না করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত বিবরণ এড়িয়ে চলা এবং ঘটনার সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার অংশ। একই সঙ্গে আদালতের রায় সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের সময় সাজা, জরিমানা ও মামলার প্রাসঙ্গিক তথ্য নির্ভুলভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সিলেট জেলা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের এ রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশও দেওয়া হয়েছে। সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ভিত্তিতেই এ সাজা ঘোষণা করা হয়েছে।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ঘোষিত এ রায় শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে আইনগত জবাবদিহির বিষয়টি সামনে এনেছে। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া কার্যকর রাখা এবং ভুক্তভোগীদের মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও স্মরণ করিয়ে দেয়। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।


