প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং আরও ২৪ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১১ জন প্রবাসী কর্মী এবং ১৩ জন পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে যাওয়া যাত্রী। তাঁদের রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আহতদের মধ্যে তিনজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন। তাঁদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস।
গত ১০ অক্টোবর বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের যাত্রী হতাহত হন। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলায় মোট ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশের দুই নাগরিকের মৃত্যু ও ২৪ জনের আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস আহত বাংলাদেশিদের অবস্থা, তাঁদের চিকিৎসা এবং আটকে পড়া যাত্রীদের সহায়তা সম্পর্কে তথ্য জানায়। দূতাবাস জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল হাসপাতালে গিয়ে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছে।
আহতদের মধ্যে কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিন বাংলাদেশি হলেন ঢাকার হাফেজ হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজী নুরুল্লাহ এবং সৌদি আরবে কর্মরত মো. ওমর ফারুক। দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তবে হামলার পর আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার বিষয়ে পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রিয়াদের ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন নওগাঁর সাফকাত রহমান ও কুমিল্লার মো. দাউদুল ইসলাম। দূতাবাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাফকাত রহমান অচেতন অবস্থায় আছেন। অন্যদিকে রিয়াদ মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকার মো. সাইমুল ইসলাম সৌরভ ও আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীন। প্রিন্স সুলতান মিলিটারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ঢাকার মো. আব্দুল্লাহ।
এ ছাড়া সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের তাখাসসুসি শাখায় আরমান হোসেনসহ তিন বাংলাদেশি কর্মী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কিংডম হাসপাতালে রয়েছেন মো. রফিক মিয়া। কিং খালেদ মেডিক্যাল সিটিতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ইসমাইল হোসাইন, মো. মিসবাহ উদ্দিন হীরক ও মো. রায়হানুল ইসলাম।
প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাঁচ বাংলাদেশি কর্মী হলেন সালমা আক্তার, মো. শাহাদাত হোসেন, মোশাহিদ আহমেদ সৈকত, জাহিদ আহমেদ এবং সোহবে সাদেক মো. শাহজাহান সরকার। এ ছাড়া এজতাহ সনদ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মো. আসাদুল ইসলাম ও মো. জামাল। সুলাইমান ফকিহ হাসপাতালে রয়েছেন নাজমা আক্তার এবং সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের আলসাহাফা শাখায় চিকিৎসাধীন উমায়ের ও আব্দুল্লাহ কামিল। আহতদের চিকিৎসা পরিস্থিতি সম্পর্কে দূতাবাসের সঙ্গে হাসপাতালগুলোর যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, আহত বাংলাদেশিরা রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে ট্রানজিটে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের মধ্যে যেমন সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাত্রীরাও। ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেও বিমানবন্দরের একই ঘটনায় তাঁদের অনেকে আহত হয়েছেন। স্বজনদের কাছে তাঁদের শারীরিক অবস্থার খবর পৌঁছানো এবং চিকিৎসার অগ্রগতি জানা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশি হতাহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাঁদের সহায়তা নিশ্চিত করতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর কাজ করছে। এর আগে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন বগুড়ার মো. শাহেদ আহমেদ ও কুমিল্লার নাসরুল্লাহ বদরপুরী। শাহেদ আহমেদ সৌদি আরবে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে তিনি রিয়াদ হয়ে জেদ্দায় যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। নাসরুল্লাহ বদরপুরী ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং জেদ্দায় যাওয়ার জন্য রিয়াদ বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন।
হামলার পর বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় রিয়াদে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি যাত্রী আটকা পড়েন। দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আসা এবং রিয়াদ হয়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর কিংবা অন্য দেশে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রায় ৫০০ যাত্রী এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। রিয়াদ থেকে বাংলাদেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরাও ফ্লাইট বিঘ্নের কারণে সমস্যায় পড়েন। তাঁদের আবাসন, খাবার ও বিকল্প যাত্রাপথের ব্যবস্থা করতে দূতাবাস উদ্যোগ নেয়।
টার্মিনাল-৩ এলাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন ফ্লাইটের প্রায় ১০০ যাত্রীর জন্য আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের মধ্যে সৌদিয়া এয়ারলাইনস, রিয়াদ এয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে বাংলাদেশ থেকে আসা যাত্রী এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা ছিলেন। তাঁদের মেরিয়ট ও রেডিসন হোটেল এবং প্রিন্সেস নূরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে রাখার ব্যবস্থা করা হয় বলে দূতাবাস জানিয়েছে।
ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে গিয়ে ইহরামের পোশাক পরা ৬৭ জন যাত্রীর জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁদের বিশেষ বাসে রিয়াদ থেকে জেদ্দায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে যাত্রীরা তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছানোর বিকল্প সুযোগ পান। তবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া জরুরি।
রিয়াদ-ঢাকাগামী সৌদিয়া এয়ারলাইনসের বাতিল হওয়া এসভি-৮০৪ ফ্লাইটের প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি যাত্রীকে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রিয়াদ থেকে বাহরাইনগামী দুই বাংলাদেশি কর্মীকে আলখোবার স্থলবন্দর দিয়ে বাহরাইন যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আটকে পড়া যাত্রীদের বিকল্প পথে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বিমানবন্দরের মতো আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার ঘটনায় হতাহতদের পাশাপাশি বহু যাত্রীর ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এবং দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূতাবাসের হাসপাতালগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, আহতদের খোঁজখবর নেওয়া এবং আটকে পড়া যাত্রীদের আবাসন ও বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহতের ঘটনায় সরকার শোক ও নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে হতাহতদের পরিচয় ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। আহতদের শারীরিক অবস্থার পরবর্তী হালনাগাদ এবং আটকে পড়া যাত্রীদের দেশে ফেরার অগ্রগতি এখন নজরে থাকবে।
রিয়াদের এই হামলায় দুই বাংলাদেশির প্রাণহানি এবং ২৪ জনের আহত হওয়ার ঘটনায় প্রবাসী কর্মী ও ওমরাহযাত্রীদের নিরাপত্তা আবারও আলোচনায় এসেছে। আহতদের দ্রুত সুস্থতা, তাঁদের পরিবারের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছানো এবং আটকে পড়া যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দূতাবাস জানিয়েছে, চিকিৎসা ও যাত্রী সহায়তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।


