প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের মাটিতে শেকড় গাড়া লোকজ সুর এবার জায়গা করে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমায়। স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘ওঝার গান’ থেকে তৈরি ‘বিলাই ম্যাও ম্যাও’ এখন টালিউডের নতুন সিনেমা ‘বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু’র প্রচারণায় আলোচনায়। গানটির কথা ও সুর তৈরি করেছেন বাংলাদেশের সিলেটের শিল্পী আনহার মিয়া। তাঁর সৃষ্টি ভারতের বাংলা সিনেমার পরিসরে পৌঁছে যাওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সিলেটের লোকজ সংগীত ও তার সম্ভাবনা।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে আগামী ১৫ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে শিবপ্রসাদ মুখার্জি ও নন্দিতা রায় পরিচালিত সিনেমা ‘বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু’। সিনেমাটির প্রচারণার অংশ হিসেবে গত ৯ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়েছে ‘বিলাই ম্যাও ম্যাও’ গানটি। প্রকাশিত সংস্করণে কণ্ঠ দিয়েছেন সংগীতশিল্পী বনি চক্রবর্তী। সংগীতায়োজনে রয়েছেন বনি চক্রবর্তী ও সুদীপ্ত পাল। গানটির স্রষ্টা হিসেবে আনহার মিয়ার নাম যুক্ত হওয়ায় সীমান্তের দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তৈরি হয়েছে।
সিলেটের লোকজ সংস্কৃতিতে ‘ওঝার গান’ একটি স্বতন্ত্র ধারা। স্থানীয় কবিরাজ ও লোকজ শিল্পীরা ঐতিহ্যগতভাবে রোগী দেখার সময় কিংবা বিষ নামানোর আচারকে কেন্দ্র করে এ ধরনের গান পরিবেশন করে থাকেন। এসব গানের ভাষা, সুর ও পরিবেশনার ধরনে স্থানীয় জীবনযাপন, বিশ্বাস এবং মৌখিক ঐতিহ্যের ছাপ থাকে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের গান স্থানীয় সংস্কৃতির স্মৃতি বহন করে। আনহার মিয়ার ‘বিলাই ম্যাও ম্যাও’ সেই লোকজ ধারার সঙ্গে যুক্ত একটি সৃষ্টি, যা এবার বৃহত্তর চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে।
আনহার মিয়া গানটি তৈরি করেছিলেন প্রায় তিন বছর আগে। গানটির কথা ও সুর তাঁর নিজের। অর্থাৎ, সিনেমায় ব্যবহারের জন্য গানটি নতুন করে তৈরি হয়নি; বরং আগে তৈরি হওয়া একটি লোকজ ঘরানার গান পরে চলচ্চিত্রের সংগীত আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, স্থানীয় পরিসরে তৈরি সংগীতও সময়ের ব্যবধানে নতুন শ্রোতা ও নতুন মাধ্যম খুঁজে পেতে পারে। তবে গানটির চলচ্চিত্রে ব্যবহারের মাধ্যমে সিলেটের লোকজ সংগীতের কতটা বিস্তৃত পরিচিতি তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে শ্রোতাদের সাড়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংগীত নিয়ে আরও কাজের ওপর।
গানটির সিনেমায় যুক্ত হওয়ার পেছনে যোগাযোগের একটি ঘটনাও রয়েছে। আনহার মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান প্রযোজক অনন্যা রুমার মাধ্যমে সিনেমাটির নির্মাতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। শুরুতে তাঁকে পাওয়া না যাওয়ায় বনি চক্রবর্তী গানটিতে কণ্ঠ দেন। পরে আনহার মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি কলকাতায় গিয়ে নিজের কণ্ঠেও গানটি রেকর্ড করেন।
আনহার মিয়া গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় যান এবং ২৫ সেপ্টেম্বর গানটির রেকর্ডিং করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে বলা হয়েছিল, তাঁর কণ্ঠের সংস্করণটি পরে প্রকাশ করা হবে। তবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত সংস্করণে বনি চক্রবর্তীর কণ্ঠই সামনে এসেছে। আনহার মিয়ার কণ্ঠে রেকর্ড করা সংস্করণ কবে প্রকাশিত হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তারিখ জানা যায়নি।
নিজের কণ্ঠের সংস্করণ এখনো প্রকাশিত না হওয়ায় হতাশ নন আনহার মিয়া। তাঁর বক্তব্য, সিনেমাটির পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখার্জি তাঁকে যথেষ্ট সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি ভালো সম্মানীও পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। শিল্পীর এই প্রতিক্রিয়ায় কাজের স্বীকৃতি ও পেশাগত সম্মানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একটি গানের স্রষ্টা হিসেবে তাঁর প্রত্যাশা থাকতে পারে নিজের কণ্ঠে গানটি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর; কিন্তু একই সঙ্গে সিনেমার নির্মাতাদের কাছ থেকে পাওয়া সম্মানকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
‘বিলাই ম্যাও ম্যাও’ গানটি শুধু সিনেমার অডিও প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নেই; প্রচার কার্যক্রমেও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজনের মাধ্যমে গানটির পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি ‘বিগ বস বাংলা’র অনুষ্ঠানে গানটির তালে নেচেছেন সিনেমার পরিচালক ও অভিনেতা শিবপ্রসাদ মুখার্জি, অভিনেত্রী কৌশানি মুখার্জি এবং অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক সৌরভ গাঙ্গুলি। এর ফলে গানটি সিনেমার প্রচারণার অংশ হিসেবে আরও বেশি দর্শকের নজরে আসার সুযোগ পেয়েছে।
সিনেমাটিতে শিবপ্রসাদ মুখার্জি ও কৌশানি মুখার্জির পাশাপাশি অভিনয় করেছেন যীশু সেনগুপ্ত, সোহিনী সরকার, প্রদীপ ভট্টাচার্য, অপূর্ব বর, তিতিক্ষা দাস ও রজতাভ দত্তসহ আরও অনেকে। দুর্গাপূজার সময় পশ্চিমবঙ্গে বড় পরিসরে বাংলা সিনেমা মুক্তির যে প্রচলন রয়েছে, ‘বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু’ও সেই উৎসবমুখর সময়কে সামনে রেখে মুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সিনেমার গান ও প্রচারণা তাই মুক্তির আগেই দর্শকদের আগ্রহ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
আনহার মিয়ার এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংগীতশিল্পীদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা লোকজ গান, পালা, আচারভিত্তিক সংগীত ও মৌখিক ঐতিহ্যের অনেক কিছুই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে এখনো পর্যাপ্তভাবে নথিভুক্ত হয়নি। এসব সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের পরিচিতি, তাঁদের কাজের স্বীকৃতি এবং সৃষ্টির যথাযথ কৃতিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও ডিজিটাল সংগীতমাধ্যমের সঙ্গে লোকজ সুরের সংযোগ তৈরি হলে নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও এসব ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন।
তবে লোকজ গানকে নতুন মাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে মূল স্রষ্টার পরিচয়, গানের উৎস এবং ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপট সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি গান জনপ্রিয় হয়ে উঠলে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অঞ্চল ও শিল্পীর পরিচিতিও যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আনহার মিয়ার ক্ষেত্রে গানের কথা ও সুরের স্রষ্টা হিসেবে তাঁর নাম আলোচনায় আসা সেই স্বীকৃতিরই একটি অংশ। তাঁর কণ্ঠের রেকর্ড করা সংস্করণ ভবিষ্যতে প্রকাশিত হলে শ্রোতারা একই গানের ভিন্ন পরিবেশনাও শোনার সুযোগ পেতে পারেন।
সিলেটের ‘বিলাই ম্যাও ম্যাও’ এখন পশ্চিমবঙ্গের সিনেমার প্রচারণায় ব্যবহৃত হচ্ছে—এই খবরের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সংগীতের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার একটি গল্প সামনে এসেছে। এর কেন্দ্রে রয়েছেন আনহার মিয়া, যাঁর কয়েক বছর আগে তৈরি করা গান নতুন একটি সাংস্কৃতিক পরিসরে জায়গা পেয়েছে। গানটির জনপ্রিয়তা কত দূর ছড়াবে, তা সময়ই বলবে। তবে এই ঘটনা সিলেটের লোকজ সংগীতকে নতুন করে পরিচিত করার এবং স্থানীয় শিল্পীদের কাজ বৃহত্তর শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরার একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে।


