প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীতে জলাতঙ্কের ঝুঁকি কমাতে বেওয়ারিশ ও পোষা কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)। নগরীর ৪২টি ওয়ার্ডে ১৫ দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। টিকা দেওয়ার পর কুকুরগুলোকে বিশেষ রঙের চিহ্ন দিয়ে শনাক্ত করা হবে, যাতে কোন কুকুর টিকা পেয়েছে আর কোনটি পায়নি, তা সহজে বোঝা যায়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১১টায় নগরের মির্জা জাঙ্গাল এলাকার জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সিসিকের উদ্যোগে পরিচালিত এ কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে চারটি দল কাজ করবে। কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু কুকুরের টিকাদান নয়, বরং প্রাণী নিধনের পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব। নগরের বিভিন্ন এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লা ও হাসপাতালের আশপাশে কুকুরের উপদ্রব নিয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে কুকুর নিধন সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কুকুরের কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে জলাতঙ্কের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতেই টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ঢাকা থেকে আসা বিশেষ কর্মীরা চারটি দলে ভাগ হয়ে আগামী ১৫ দিন মাঠপর্যায়ে কাজ করবেন। নগরের ৪২টি ওয়ার্ডে বেওয়ারিশ কুকুরের পাশাপাশি পোষা কুকুরকেও টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য সিটি কর্পোরেশনের একজন মনোনীত প্রতিনিধিও দায়িত্ব পালন করবেন। এতে মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং টিকাদান কার্যক্রমের আওতা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
কুকুরকে টিকা দেওয়ার পর বিশেষ রঙের চিহ্ন দিয়ে শনাক্ত করার ব্যবস্থাটি কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নগরের বিভিন্ন এলাকায় একই কুকুরকে বারবার টিকা দেওয়ার পরিবর্তে যেসব কুকুর এখনো টিকা পায়নি, তাদের শনাক্ত করে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে মাঠপর্যায়ে যথাযথ নজরদারি, ওয়ার্ডভিত্তিক সমন্বয় এবং নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন এলাকা ও প্রতিষ্ঠান থেকে কুকুরের উপদ্রব নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ সমন্বিতভাবে টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। সিসিকের অর্থায়নে ১৫ দিনব্যাপী নগরের ৪২টি ওয়ার্ডে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। টিকা দেওয়ার পর কুকুরকে রঙের মাধ্যমে চিহ্নিত করায় টিকাপ্রাপ্ত ও টিকাবিহীন কুকুরের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে।
কর্মসূচি উদ্বোধনের সময় সিসিকের প্রশাসক বলেন, নগরীকে সুন্দর ও নিরাপদ করার উদ্যোগে প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। কুকুর নিধনের পরিবর্তে টিকাদানের মাধ্যমে জলাতঙ্কের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যেসব এলাকায় কুকুরের উপদ্রব বেশি, সেসব এলাকার তথ্য দিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করতে হবে। নাগরিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সিসিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো এলাকায় কুকুরের উপদ্রব বেশি হলে সিটি কর্পোরেশনের হটলাইন, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কিংবা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে তথ্য জানানো যাবে। নগরবাসীর সহযোগিতায় টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিসিকের সচিব মো. আশিক নূর, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম, ম্যাস ডগ ভ্যাকসিনেশন এক্সপার্ট ডা. হাবিবুর রহমান, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ভেটেরিনারি সার্ভিসের টিম কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. কামরুল ইসলাম ও হাসান সাইয়েদুল মুরসালিন। এ ছাড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধি ডা. আবু সালমান, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাহিদ আরজুমান বানু, ডা. আব্দুস শহিদ হোসেন, ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ও ডা. শারমিন আক্তারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জোনায়েদ কবীর অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কুকুরের টিকাদান কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কুকুরের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণ প্রতিরোধে কুকুরের ব্যাপক টিকাদান অন্যতম কার্যকর কৌশল। শুধু বেওয়ারিশ কুকুর সরিয়ে দেওয়া বা নিধন করে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী সমাধান হয় না; বরং প্রাণীর টিকাদান, জনসচেতনতা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশেও জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে কুকুরের টিকাদান ও কামড়ের পর মানুষের চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–এর বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে এ কৌশলের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি চললেও কোনো ব্যক্তি কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর ক্ষতস্থান সাবান ও প্রবহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মানুষের জলাতঙ্ক প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকা বা অন্য চিকিৎসা লাগবে কি না, তা স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নির্ধারণ করবেন। অনুযায়ী, উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই যথাযথ প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট নগরের ৪২টি ওয়ার্ডে সাড়ে চার হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়ার এই উদ্যোগ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও প্রাণিকল্যাণ—দুই ক্ষেত্রেই তাৎপর্যপূর্ণ। তবে কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, মাঠপর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় এবং ভবিষ্যতে টিকাদানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর। পাশাপাশি পোষা কুকুরের মালিকদেরও নিজেদের প্রাণীকে নিয়মিত টিকার আওতায় রাখা প্রয়োজন।
নগরবাসী, সিটি কর্পোরেশন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত সহযোগিতায় কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সিলেটে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। প্রাণী নিধনের পরিবর্তে টিকাদান, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নগরকে আরও নিরাপদ করার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।


