প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় নিজ বসতঘর থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলা সদরের পশ্চিমপাড়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে মো. শাহীন কাদির (৪৮) নামে ওই নেতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি এনসিপির ধর্মপাশা উপজেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
শাহীন কাদির পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত সুনু কাদিরের ছেলে। তার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কী পরিস্থিতিতে তিনি এমন একটি চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা নিয়ে স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পুলিশ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে শাহীন কাদির বাড়ির একটি কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর তিনি ভেতর থেকে কক্ষটির দরজা বন্ধ করে দেন। কিছুক্ষণ পর পরিবারের সদস্যরা তাকে রাতের খাবারের জন্য ডাকাডাকি শুরু করেন। কিন্তু বারবার ডাক দেওয়ার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না।
এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। তারা দরজা খোলার চেষ্টা করলেও ভেতর থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় একপর্যায়ে দরজা ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করেন। তখন তারা শাহীন কাদিরকে ঘরের ভেতরে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। আকস্মিক এ দৃশ্য পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে ধর্মপাশা থানার সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করা হয়নি।
ধর্মপাশা থানার উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলাম জানান, মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহীন কাদির দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। বিশেষ করে মেরুদণ্ডের সমস্যার কারণে তিনি প্রায়ই ব্যথায় কাতরাতেন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও তার শারীরিক অবস্থায় প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক কষ্ট তার দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলেছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তার মৃত্যুর সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতার সম্পর্ক ছিল কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
নিহতের ভাতিজা আসিফ আহমেদ বলেন, তার চাচা দীর্ঘদিন ধরে মেরুদণ্ডের সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায়ই তীব্র ব্যথায় কাতরাতে দেখা যেত তাকে। চিকিৎসা করানো হলেও তেমন সুফল পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা তার শারীরিক কষ্ট সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এমন কোনো বিষয় তারা বুঝতে পারেননি বলেও জানান স্বজনরা।
শাহীন কাদিরের মৃত্যু রাজনৈতিক অঙ্গনেও শোকের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এনসিপির ধর্মপাশা উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আজিজুল হক তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, শাহীন কাদির কেন এমন পথ বেছে নিলেন, তা তারা বুঝতে পারছেন না। তার মৃত্যুতে দলের নেতাকর্মীরা শোকাহত।
স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে শাহীন কাদিরের পরিচিতি ছিল। এনসিপির ধর্মপাশা উপজেলা শাখায় যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে দলীয় সহকর্মীদের মধ্যেও শোক ও বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
একজন মানুষের আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ওপরই প্রভাব ফেলে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্বজনদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ এবং পরিচিত মানুষের স্মৃতি। শাহীন কাদিরের ক্ষেত্রেও তার পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের কাছে এই মৃত্যু আকস্মিক ও বেদনাদায়ক হয়ে এসেছে। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের সামনে নিজ ঘর থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি স্বজনদের জন্য গভীর মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে কোনো ধরনের অনুমান বা গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে পুলিশ ঘটনাটির আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নানা ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্য, স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে নিয়মিত মানসিক সহায়তা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে শাহীন কাদিরের ক্ষেত্রে তার মৃত্যুর পেছনে ঠিক কী কারণ কাজ করেছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর পরিস্থিতি, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও পর্যালোচনা করা হবে। এদিকে শাহীন কাদিরের মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ভার, আর রাজনৈতিক সহকর্মীরা হারিয়েছেন তাদের একজন পরিচিত সংগঠককে।
ধর্মপাশার পশ্চিমপাড়া গ্রামের এই ঘটনায় এখন পরিবারের স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার অপেক্ষা রয়েছে। পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলাফলই এ বিষয়ে পরবর্তী তথ্যের ভিত্তি হবে


