প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জে আবারও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ এবং এ পর্যন্ত জেলার সর্বাধিক দৈনিক বৃষ্টিপাত বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। অস্বাভাবিক এই বৃষ্টিপাতের ফলে জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ি ঢলে তাহিরপুর উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জেলা শহরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টার ভারী বর্ষণে সুরমা, কুশিয়ারা, বৌলাইসহ জেলার ছোট-বড় প্রায় সব নদীর পানির স্তর ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ শহরের নবীনগর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি ৫১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে নদীটির পানি বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।
পাহাড়ি ঢলের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন তাহিরপুর উপজেলার বাসিন্দারা। উপজেলার আনোয়ারপুর সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জেলা শহরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয়দের যাতায়াত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন এবং জরুরি সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে অনেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় সেই যাত্রাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল, হাওর এবং নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষ ইতোমধ্যেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। অনেক পরিবার বাড়ির প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখছেন। গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে নেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। অতীতের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আগাম সতর্কতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক জানিয়েছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের উজানেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে উজানের ঢল আরও বাড়তে পারে এবং জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে মৌসুমি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদীর পানি বৃদ্ধির তথ্য সার্বক্ষণিক সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে যাতে পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এসব কেন্দ্র ব্যবহৃত হবে। এছাড়া উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ৪৯২টি নৌযান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে কাজ করার জন্য বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১ হাজার ৫৬টি মেডিকেল টিমও প্রস্তুত রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীও মজুত করা হয়েছে। চাল, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে দুর্যোগ দেখা দিলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সাধারণ মানুষকে আগাম সতর্ক করতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও নিজ নিজ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর খোঁজখবর রাখা এবং প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উজানের পানি খুব দ্রুত এ জেলায় প্রবেশ করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হলে সুনামগঞ্জের হাওর ও নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। তাই আগাম সতর্কতা, দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা এবং কার্যকর ত্রাণ বিতরণই সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের প্রস্তুতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তারা দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাদের মতে, নদী খনন, পানি নিষ্কাশনের উন্নয়ন এবং টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তোলা না গেলে প্রতি বর্ষায় একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
বর্তমানে সুনামগঞ্জের সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং উজানের পানির প্রবাহ বিবেচনায় আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং জরুরি প্রয়োজনে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


