প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সর্বশেষ এই মৃত্যুর ফলে চলতি বছরে সিলেট বিভাগে হামে আক্রান্ত অথবা হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ জনে। একই সময়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নতুন করে আরও বহু রোগী ভর্তি হওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার মধ্যে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচ মাস বয়সী আবু সায়েদের মৃত্যু হয়। শিশুটি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা এলকাস উদ্দিনের ছেলে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, শিশুটির মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত নজরদারি প্রতিবেদনে এই মৃত্যুর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২৪৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই সময়ে নতুন করে আরও ৬০ জন সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার এই ধারা স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে ৪৮৩ জনের শরীরে হাম ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার বাইরে আরও অনেক রোগী থাকতে পারেন, যারা বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা নিজ বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং চারজনের ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর পেছনে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য জটিলতা ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে বিস্তারিত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেওয়া হামের প্রধান লক্ষণ। অধিকাংশ রোগী সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলেও শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের হাম ও রুবেলা প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হলেও কোনো কারণে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন চিকিৎসকরা।
সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ড এবং সংক্রামক রোগ ইউনিটে রোগীর চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে বলে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সরা দিনরাত রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিভাগও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নতুন রোগীর সংখ্যা, ভর্তি, ছাড়পত্র ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করছে।
এদিকে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়লেও চিকিৎসকরা আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কোনো শিশুর জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। নিজের উদ্যোগে ওষুধ সেবন বা চিকিৎসা বিলম্বিত করলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা শিশুদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়ার কাজও চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে ব্যক্তি, পরিবার এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা নিশ্চিত করা, অসুস্থ শিশুদের দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া এবং সংক্রমণ ছড়ানো রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
সিলেট বিভাগে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।


