প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল আবারও খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও ন্যাক্কারজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে। এবার হাসপাতালের ইন্টার্ন নার্সিং শিক্ষার্থীদের ওপর আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত ওয়ার্ডবয়দের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো হাসপাতাল প্রাঙ্গণ। ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় ইন্টার্ন নার্সদের মারধর, ভাঙচুর এবং পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদানের ঘটনাটি চিকিৎসা সেবার পবিত্রতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। হাসপাতালে দায়িত্বরত নার্সিং শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে সেবা প্রদান করছেন, সেই কর্মস্থলেই তাদের নিরাপত্তা নিয়ে এখন বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে, যখন হাসপাতালের আউটডোর বিল্ডিংয়ের নিচতলায় সার্জিক্যাল মাইনর ওটি বা অপারেশন থিয়েটারের ড্রেসিং রুমে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ইন্টার্ন ডিউটিরত বেসরকারি নার্সিং কলেজের দুজন ছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালের আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ওয়ার্ডবয় জামাল আহমদ ও অঞ্জন সরকার অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ইভটিজিং করে আসছিলেন। বুধবার বিষয়টি অসহ্য পর্যায়ে পৌঁছালে ভুক্তভোগী ছাত্রীরা তাদের ইন্টার্ন অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেন। অভিযোগ পেয়ে মো. তাহমিদ ও প্রীতম রঞ্জন দাসসহ প্রায় আটজন ইন্টার্ন শিক্ষার্থী ড্রেসিং রুমে গিয়ে নার্সিং স্টাফ মো. জাহাঙ্গীর আলমের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে যান। অভিযোগ ছিল, স্টাফ জাহাঙ্গীর আলমকে আগে এ বিষয়ে অবগত করা হলেও তিনি কোনো সুরাহা করেননি।
সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ জানানোর সময় ওয়ার্ডবয় জামাল আহমদ চরম উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে তিনি ও তার সহযোগীরা ইন্টার্ন শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এই হামলায় আহত হন সুরমা নার্সিং কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তাহমিদ, আল-আমিন নার্সিং কলেজের রবিউল আউয়াল শুভ এবং ওয়েসিস নার্সিং ইনস্টিটিউটের প্রীতম রঞ্জন দাস। মারামারি চলাকালীন অপারেশন থিয়েটারের কাচ ও মূল্যবান চিকিৎসা সামগ্রী ভাঙচুর করা হয়। আহত তিন শিক্ষার্থী বর্তমানে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পার্কভিউ মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন নার্স হাবিবুর রহমান ক্ষোভের সঙ্গে জানান, কেবল ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করার দায়ে নার্সদের ওপর বারবার এমন হামলা চালানো হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এই ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে শিক্ষার্থীরা এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তারা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। পরে শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল পরিচালকের কাছে লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করেন। ঘটনার ভয়াবহতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশনের (বিএনএ) সাধারণ সম্পাদক সোহেল আহমদ। তিনি সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িতদের নিরাপত্তা আজ চরম সংকটের মুখে। অতীতে দেখা গেছে রোগীর স্বজনরা নার্সদের ওপর চড়াও হতেন, কিন্তু এখন খোদ হাসপাতালে কর্মরত কর্মচারীরাই এমন ন্যক্কারজনক হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নার্সদের কাজ করা অসম্ভব।
হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বিশৃঙ্খলা ও হামলাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) ডা. মোহাম্মদ বদরুল আমিন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে প্রশ্ন উঠছে, তদন্ত কমিটির ওপর আস্থা কতটা রাখতে পারবেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা? অতীতে এমন অনেক ঘটনার তদন্ত হলেও দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার হার হতাশাজনক। শিক্ষার্থীরা দাবি তুলেছেন যে, কেবল কমিটি গঠন করলেই হবে না, বরং সরাসরি হামলাকারীদের চিহ্নিত করে তাদের চাকরিচ্যুতিসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
হাসপাতাল হলো এমন একটি জায়গা যেখানে জীবন রক্ষার জন্য মানুষ আসে, সেখানে হাসপাতালেরই কর্মীরা যদি ইভটিজিং বা হামলার মতো অপরাধে লিপ্ত হয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? ওয়ার্ডবয়দের এমন বেপরোয়া আচরণ প্রমাণ করে যে, আউটসোর্সিং কর্মীদের নিয়োগ ও আচরণের ওপর প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কতটা শিথিল। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার অভাবই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির অন্যতম কারণ। নার্সদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে রোগীদের সেবার ওপর। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো এবং বহিরাগত বা আউটসোর্সিং কর্মচারীদের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো সময়ের দাবি।
সবশেষে বলা যায়, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সংঘাত নয়, বরং এটি স্বাস্থ্য খাতের একটি গভীর ক্ষত। নার্সিং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনোভাবেই যেন প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে না যায়, সেদিকে সচেতন নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সিলেটের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং নার্সদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। আমরা প্রত্যাশা করি, কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিক্ষারত ইন্টার্ন নার্সদের মনে স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনবে। একজন শিক্ষার্থী বা নার্স যেন তার কর্মস্থলে অপদস্থ হওয়ার ভয় না পায়, সেটাই এখনকার বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।


