প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত অঞ্চলের শান্ত জনপদ শুক্রবার এক ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কবলে পড়েছিল। অবৈধভাবে পাথর পরিবহনের অভিযোগে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি টহল দল ট্রাক আটক করলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় পাথর শ্রমিকরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক দীর্ঘ দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, যার ফলে হাজারো যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন আটকা পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়। পাথর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও পরিবহন খাতের মানুষদের সঙ্গে বিজিবির সংঘর্ষ ও উত্তেজনার এই দৃশ্য যেন সীমান্ত অঞ্চলের এক চিরচেনা অস্থিরতারই প্রতিফলন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এ ঘটনা স্থানীয় ব্যবসায়িক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ভঙ্গুরতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার ভোররাতে। ৪৮ বিজিবির একটি টহল দল জৈন্তাপুরের শ্রীপুর খড়মপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাথরবোঝাই চারটি ট্রাক জব্দ করে। অবৈধ পাথর পরিবহনের বিরুদ্ধে বিজিবির নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিজিবি যখন জব্দকৃত ট্রাকগুলো ক্যাম্পে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। স্থানীয় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের একটি সংঘবদ্ধ দল অতর্কিতভাবে বিজিবিকে বাধা দেয় এবং শক্তি প্রয়োগ করে ট্রাকগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বিজিবির ভাষ্যমতে, শ্রমিকরা জোরপূর্বক তিনটি ট্রাক গুচ্ছগ্রাম এলাকায় নিয়ে গিয়ে পাথরগুলো আনলোড করে দেয়। এ সময় একটি ট্রাক পাথর ফেলে পালানোর চেষ্টা করলে বিজিবি সেটি আবারও আটক করে।
ট্রাক আটকের এই ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে শ্রমিকদের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের অভিযোগ, অভিযানে বিজিবি সদস্যরা ট্রাকচালকের ওপর চড়াও হন এবং তাকে শারীরিক নির্যাতন করেন। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা এর প্রতিবাদে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের গুচ্ছগ্রাম এলাকায় ব্যারিকেড তৈরি করে সড়ক অবরোধ করে ফেলেন। রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে শ্রমিকদের বিক্ষোভ প্রদর্শনের ফলে মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয় যে, পাথর পরিবহন তাদের জীবিকার একমাত্র উৎস এবং প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে তারা আজ অন্নহীন হওয়ার পথে। অন্যদিকে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা শটগান থেকে এক রাউন্ড সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে খবর পেয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুনন্দা রায় দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাথর ব্যবসায়ী সমিতির নেতা এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসেন। দুই ঘণ্টা ধরে চলা রুদ্ধশ্বাস আলোচনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুরাহার আশ্বাস পেয়ে শ্রমিকরা অবরোধ তুলে নিতে সম্মত হন। এদিকে এই ঘটনার আইনগত দিক বিবেচনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজ পলি রানী দেব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। আদালত অবৈধভাবে পাথর পরিবহনের দায়ে আটক ট্রাকটিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার এই দণ্ড একদিকে যেমন আইন অমান্যকারীদের সতর্ক করেছে, অন্যদিকে স্থানীয় পাথর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্রের কর্মকাণ্ডকে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সিলেটের পাথর কোয়ারি ও জৈন্তাপুরের সীমান্ত এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বৈধ বা অবৈধ—এই দ্বন্দ্বের মাঝে প্রতিনিয়ত পেশাজীবী শ্রমিকরা হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষায় পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতি এই পাথর ব্যবসার ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। এই ভারসাম্যহীনতা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখনই এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, কেবল বলপ্রয়োগ বা ট্রাক আটকের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারিভাবে পাথর ব্যবসার একটি যৌক্তিক ও টেকসই রূপরেখা, যাতে সাধারণ শ্রমিকরা তাদের কর্মসংস্থান হারানো থেকে মুক্তি পায় এবং পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে।
বিজিবির মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী এবং স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের এই মুখোমুখি অবস্থান কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। পাথর পরিবহনের নামে অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে যেমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তেমনি সাধারণ শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। মহাসড়ক অবরোধের ফলে যে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে। জৈন্তাপুরের এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের উচিত আলোচনার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খুঁজে বের করা।
পরিশেষে বলা যায়, শুক্রবারের এই ঘটনাটি সীমান্তে আইনের শাসন ও জনস্বার্থের এক সংঘাতময় মুহূর্তের দলিল হয়ে থাকল। প্রশাসন ও স্থানীয় স্টেকহোল্ডারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অবরোধ প্রত্যাহার করা সম্ভব হলেও এই ধরনের উত্তেজনা যেন আর না ঘটে, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা আশা করি, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিজিবি আরও ধৈর্য ও কৌশলী ভূমিকা পালন করবে এবং ব্যবসায়িক অসাধু চক্রের কারসাজি রুখতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকবে। জৈন্তাপুরবাসীকে এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিতে হলে প্রয়োজন আইনের স্বচ্ছ প্রয়োগ এবং সাধারণ শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। শান্তি ও শৃঙ্খলাই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি—এই বিশ্বাস নিয়ে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক যেন সবসময় নির্বিঘ্নে চলাচলযোগ্য থাকে, সেটিই প্রত্যাশা।


