প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের ঐতিহ্যবাহী ও দীর্ঘদিনের আস্থার প্রতীক সেন্ট্রাল ফার্মেসি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, গুঞ্জন ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের তথ্য ও অনুমান, অন্যদিকে ফার্মেসি সংশ্লিষ্ট পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে—এটি কোনো স্থায়ী বন্ধ নয়, বরং একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত।
সিলেটের চৌহাট্টা এলাকায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ প্রায় আট দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি শুধু একটি ওষুধের দোকান হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সিলেটবাসীর কাছে এটি হয়ে উঠেছে নির্ভরতার প্রতীক। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদানকারী এই ফার্মেসি অসংখ্য মানুষের জরুরি মুহূর্তে ভরসার জায়গা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
এমন একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে তাই স্বাভাবিকভাবেই শহর ও প্রবাসী সিলেটিদের মধ্যে গভীর আবেগ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটির পুনরায় চালুর দাবি জানাচ্ছেন।
এদিকে ফার্মেসির পরিবারিক পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্য লিপি অন্যুথা এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, সেন্ট্রাল ফার্মেসি বন্ধ রাখা সম্পূর্ণ একটি পারিবারিক ও ব্যবস্থাপনাগত সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, এর পেছনে কোনো রহস্য বা নাটক নেই, বরং সাময়িক ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু মহল ভিত্তিহীন গুজব ছড়াচ্ছে, যেখানে পারিবারিক কলহ বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মতো বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে। এসব তথ্য সম্পূর্ণ অসত্য এবং বিভ্রান্তিকর বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, এই ধরনের মিথ্যাচার শুধু পরিবারের জন্যই নয়, দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মানের জন্যও ক্ষতিকর।
সিলেট শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই ফার্মেসির বন্ধ হওয়া নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন এর প্রকৃত কারণ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক ইব্রাহিম চৌধুরী। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ লেখায় জানান, প্রতিষ্ঠানটি কোনো পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে বন্ধ হয়নি।
তার ভাষ্যমতে, পরিবারের অনেক সদস্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন। ফলে দেশে থেকে ব্যবসার দৈনন্দিন তদারকি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছিল। একই সঙ্গে প্রবীণ সদস্যদের অনেকেই বয়স ও শারীরিক কারণে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম নন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে আপাতত কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সেন্ট্রাল ফার্মেসির সঙ্গে সিলেটবাসীর আবেগ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বহু প্রজন্ম এই প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা গ্রহণ করেছে। তাই এর সাময়িক বন্ধের খবর অনেকের জন্যই বেদনাদায়ক। তবে এটিকে পারিবারিক দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থাপন করা অনুচিত এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর শামিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রচার করলে তা শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করে না, বরং দীর্ঘদিনের সুনাম ও সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে মনে করছেন, সেন্ট্রাল ফার্মেসি শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং সিলেটের শহুরে ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি অংশ। চৌহাট্টা এলাকার এই প্রতিষ্ঠানটি বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বিশেষ করে জরুরি ওষুধ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে পরিচিত ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ব্যবসা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থাপনা ও উত্তরাধিকারের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। প্রজন্ম পরিবর্তন, প্রবাসে বসবাস এবং আধুনিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনার জটিলতা অনেক সময় পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে।
তবে পরিবার সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, এটি স্থায়ী বন্ধ নয়। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। এই আশাবাদই অনেককে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।
এদিকে সিলেটবাসীর একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফার্মেসিটি পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও জনসেবার স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখা উচিত।
সব মিলিয়ে সেন্ট্রাল ফার্মেসি বন্ধ হওয়াকে ঘিরে সিলেটে একটি আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একদিকে গুজব ও বিভ্রান্তি, অন্যদিকে বাস্তবতা ও পারিবারিক ব্যাখ্যা—এই দুইয়ের মাঝেই এখন শহরবাসী সত্য তথ্য জানার অপেক্ষায়।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ভুল তথ্যের অবসান ঘটিয়ে দ্রুতই প্রকৃত পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে এবং সিলেটের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান নিয়ে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে।


