প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে বাজার তদারকি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) একগুচ্ছ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ফ্র্যাঞ্চাইজি, ডিস্ট্রিবিউটর এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো এলপিজির প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি যাচাই করা, কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে তা শনাক্ত করা এবং নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির ঘটনা ঘটলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। রান্নার কাজে বহুল ব্যবহৃত এই জ্বালানির দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে বাজার তদারকির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, এলপিজির সরবরাহ ও বিতরণ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য জ্বালানি বিভাগ দেশের সব জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অনলাইনে মতবিনিময় সভা করেছে। ওই সভায় বাজার তদারকি এবং সরবরাহব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রত্যেক জেলা প্রশাসককে নিজ জেলার সব এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম সংগ্রহ করলেই চলবে না, সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত পরিচয়ও যথাসম্ভব নথিভুক্ত করতে হবে। এতে জেলা পর্যায়ে এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে কারা যুক্ত এবং কোন প্রতিষ্ঠান কোন এলাকায় পণ্য সরবরাহ করছে, সে সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সরকারি নির্দেশনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সরবরাহের পরিমাণ যাচাই। সংশ্লিষ্ট এলপিজি অপারেটর থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি, মাস্টার ফ্র্যাঞ্চাইজি, ডিস্ট্রিবিউটর এবং ডিলার পর্যায়ে কত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে, তার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপের হিসাব মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে কোথাও অস্বাভাবিক ঘাটতি বা তথ্যের অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকদের অবিলম্বে নিজ নিজ জেলার এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের সঙ্গে বৈঠক করতে হবে। এসব বৈঠকে জেলার সরবরাহ পরিস্থিতি, বিতরণব্যবস্থা এবং বাজারজাতকরণের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করা হবে। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে অপারেটরদের সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য তুলনা করে দেখা হলে বাজারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হবে।
কোনো এলাকায় এলপিজি সরবরাহে অস্বাভাবিক ঘাটতি দেখা দিলে, সরবরাহব্যবস্থায় অনিয়মের লক্ষণ পাওয়া গেলে কিংবা অপারেটর থেকে ডিলার পর্যায়ে সরবরাহের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য ধরা পড়লে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। এ ধরনের তথ্য জ্বালানি বিভাগসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
জাহেদ উর রহমান জানান, জেলা পর্যায় থেকে সংগৃহীত তথ্য সমন্বয় করে এলপিজি অপারেটর থেকে ডিলার পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ তথ্যভাণ্ডার কার্যকর হলে কোন এলাকায় কত পরিমাণ এলপিজি সরবরাহ হচ্ছে, কোন পর্যায়ে বিতরণ করা হচ্ছে এবং কোথায় ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হতে পারে। তবে তথ্যভাণ্ডারটি কবে নাগাদ তৈরি হবে এবং কীভাবে নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সময়সূচি জানানো হয়নি।
এলপিজির বাজারে মূল্য নিয়ে ভোক্তাদের অভিযোগের প্রধান দিক হলো নির্ধারিত দাম ও বাস্তবে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে পার্থক্য। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও খুচরা পর্যায়ে তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ ক্রেতাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবার রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক ব্যয়ের সঙ্গে সিলিন্ডারের দামের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ শুধু ব্যবসায়িক অনিয়মের বিষয় নয়; এটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গেও যুক্ত।
তবে বাজারে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের পাশাপাশি সরবরাহের প্রকৃত পরিস্থিতিও যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় সিলিন্ডার কম পাওয়া গেলে তার কারণ হতে পারে সরবরাহের ঘাটতি, পরিবহন ও বিতরণে সমস্যা কিংবা স্থানীয় বাজারের অন্য কোনো পরিস্থিতি। আবার সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া হলে তা আলাদা ধরনের অনিয়ম। সরকার যে সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে, তার মাধ্যমে এসব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ঘোষিত দুই দিনের দোকান বন্ধ কর্মসূচি বাজার পরিস্থিতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (১৫ ও ১৬ অক্টোবর) সারা দেশে এলপি গ্যাসের দোকান বন্ধ রাখা হবে। এ সময় এলপিজি বিক্রি না করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধসহ কয়েকটি দাবিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। দাবিগুলো পূরণ না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
সরকারের বাজার তদারকি জোরদারের উদ্যোগ এবং ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা একই সময়ে সামনে আসায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে সিলিন্ডারের গ্যাস দ্রুত শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের জন্য সরবরাহের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দোকান বন্ধের ঘোষণার ফলে কোন কোন এলাকায় কতটা প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কর্মসূচির বাস্তবায়ন, মজুত এবং বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার ওপর।
এ অবস্থায় বাজার স্বাভাবিক রাখতে সরকার, এলপিজি অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে ভোক্তাদের আস্থা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ও দাবিগুলোও নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে বাজারে অপ্রয়োজনীয় বিঘ্ন তৈরি না হয়।
জেলা প্রশাসকদের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের তদারকি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হবে। শুধু তালিকা তৈরি বা তথ্য সংগ্রহের মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলে বাজারের অনিয়ম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। সংগৃহীত তথ্য নিয়মিত যাচাই, অভিযোগের দ্রুত অনুসন্ধান এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে উদ্যোগটির কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে ভোক্তারা কোথায় অভিযোগ জানাবেন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য থাকা প্রয়োজন।
এলপিজির বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি, পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং ব্যবসায়ীদের ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায় কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।


