প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশজুড়ে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দুই দিন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন খাতটির পরিবেশকেরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি বন্ধ, পরিবেশকদের কমিশন পুনর্নির্ধারণ এবং অব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার পুনরায় বাজারে ছাড়ার দাবিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। দাবি পূরণ না হলে পরবর্তী সময়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি বিক্রি বন্ধের কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি সেলিম খান এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ীরা তাঁদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান। তবে এ সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এলপিজি বাংলাদেশের বহু পরিবারের দৈনন্দিন রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি। বিশেষ করে যেসব বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস নেই, সেখানে সিলিন্ডারভিত্তিক এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেশি। ফলে পরিবেশকদের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে সাধারণ গ্রাহক, খুচরা বিক্রেতা, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কর্মসূচির সময় সরবরাহ ও বিক্রির পরিস্থিতি কেমন থাকবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে হয়রানি বন্ধ করা, পরিবেশকদের কমিশন পুনর্নির্ধারণ এবং অব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার পুনরায় বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব বিষয়ে বিদ্যমান সমস্যার কারণে তাঁদের ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তাঁরা মনে করছেন, কমিশন কাঠামো পুনর্বিবেচনা এবং সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমাধান না এলে পরিবেশকদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি বন্ধের দাবিও তাঁদের কর্মসূচির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগের ধরন, নির্দিষ্ট ঘটনা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
পরিবেশকদের দাবি, তাঁদের সমস্যাগুলোর সমাধান হলে বাজারে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত হবে। অন্যদিকে, ভোক্তাদের জন্য নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের দাবি পর্যালোচনার পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম খান বলেন, বর্তমানে মাত্র ছয় থেকে সাতটি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। তাঁর দাবি, এ পরিস্থিতিতে সারাদেশে কয়েক লাখ গ্যাস সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
অব্যবহৃত সিলিন্ডারগুলো কী কারণে বাজারে ব্যবহার করা যাচ্ছে না, কোন কোন কোম্পানির সিলিন্ডার এতে অন্তর্ভুক্ত এবং সেগুলো পুনরায় বাজারে ছাড়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের বাধা রয়েছে, তা সংবাদ সম্মেলনের প্রকাশিত বিবরণে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে সিলিন্ডারের সংখ্যা ও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্যকে সংশ্লিষ্ট সমিতির দাবি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এলপিজি বাজারে সিলিন্ডারের প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি সিলিন্ডার পরিবহন, বিতরণ, পুনরায় ভর্তির ব্যবস্থা এবং বাজারে সেগুলোর চলাচল সচল থাকা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও প্রয়োজনীয় সময়ে গ্যাস সংগ্রহ করতে অসুবিধায় পড়তে হতে পারে।
তবে অব্যবহৃত সিলিন্ডার পুনরায় বাজারে ছাড়ার বিষয়টি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করা জরুরি। সিলিন্ডারের অবস্থা, ব্যবহারযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ম মেনে বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা না গেলে গ্রাহকের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই ব্যবসায়ীদের দাবি পর্যালোচনার সময় সরবরাহের স্বার্থের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম খান জানান, কর্মসূচি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় চেয়ারম্যান ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং শিগগির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তাঁকে জানিয়েছেন বলে দাবি করেন সেলিম খান।
বিইআরসি দেশের জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে দায়িত্ব পালন করে। এলপিজি ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত কমিশন ও বাজার ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত দাবির বিষয়ে কমিশনের ভূমিকা তাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্যের বাইরে কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
দাবিগুলো পর্যালোচনার কথা জানানো হলেও সেগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কমিশন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেবে কি না, কিংবা ১৫ ও ১৬ অক্টোবরের কর্মসূচির আগে কোনো অগ্রগতি হবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনার ওপর।
এ অবস্থায় ব্যবসায়ী সংগঠন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ জরুরি। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো গেলে একদিকে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ দূর করা সম্ভব হতে পারে, অন্যদিকে গ্রাহকদের জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন এড়ানো যেতে পারে।
এলপিজি বিক্রি বন্ধের ঘোষণা সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। দেশের অনেক পরিবার প্রতিদিনের রান্নার কাজে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করে। যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের সুবিধা নেই, সেখানে এলপিজির বিকল্প সহজে পাওয়া যায় না। ফলে বিক্রয়কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকলে প্রয়োজনের সময় সিলিন্ডার সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে।
শুধু বাসাবাড়ি নয়, হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, খাবারের ছোট ব্যবসা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও এলপিজির ব্যবহার রয়েছে। দুই দিনের বিক্রয় বন্ধের কারণে এসব ব্যবসার কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সিলিন্ডার সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ঘোষিত কর্মসূচির আওতা, সব পরিবেশক ও বিক্রেতা এতে অংশ নেবেন কি না এবং কোম্পানিগুলোর সরবরাহব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। তাই পুরো দেশের বাজারে কী পরিমাণ প্রভাব পড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
এ পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ী সংগঠনের উচিত কর্মসূচির বাস্তবায়ন, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য জানানো। এতে গ্রাহকেরা অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ এড়িয়ে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
একই সঙ্গে গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত মজুত করার চেষ্টা না করাই ভালো। এতে সাময়িকভাবে বাজারে চাহিদার চাপ বাড়তে পারে এবং অন্য গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহে সমস্যা তৈরি হতে পারে। স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখতে ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী ও গ্রাহক—সবার দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
সেলিম খান জানিয়েছেন, ১৫ ও ১৬ অক্টোবরের কর্মসূচির পরও দাবিগুলো পূরণ না হলে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হবে। অর্থাৎ, দুই দিনের কর্মসূচির মধ্যেই সমস্যার সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অনির্দিষ্টকালের জন্য বিক্রি বন্ধের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে এলপিজি সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব খুচরা বাজার, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং গৃহস্থালি ব্যবহারে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা নির্ভর করছে আলোচনার অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।
ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে দ্রুত সংলাপ শুরু হলে সংকট এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কমিশন, এলপিজি কোম্পানি, পরিবেশক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। দাবিগুলোর যৌক্তিকতা যাচাই, বাজারে সিলিন্ডারের প্রকৃত পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং কমিশন কাঠামো নিয়ে আলোচনা সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে।
এলপিজি খাতের সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের দৈনন্দিন প্রয়োজন জড়িত থাকায় এ ধরনের কর্মসূচির প্রভাব কেবল ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, এলপিজি ব্যবসায়ীদের ঘোষিত দুই দিনের কর্মসূচি ঘিরে এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে। ব্যবসায়ীদের দাবি পর্যালোচনার বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান যোগাযোগ করেছেন বলে সেলিম খান জানিয়েছেন। তবে দাবি পূরণে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ১৫ ও ১৬ অক্টোবরের কর্মসূচি শুরুর আগেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

