১৪ হাজার থেকে ৩ কোটির পথে মিনারের স্বপ্নযাত্রা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ বিলেরপার গ্রামের একটি টিলা আজ শুধু একটি বসতভিটা নয়, বরং একটি সফল কৃষি উদ্যোগের প্রতীক। চারদিকে হ্রদ বেষ্টিত উঁচু জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে পরিকল্পিত মিশ্র ফল বাগান, যা গড়ে তুলেছেন তরুণ উদ্যোক্তা ময়নুল ইসলাম মিনার। মাত্র ১৪ হাজার টাকার ক্ষুদ্র পুঁজি থেকে শুরু করে আজ প্রায় তিন কোটি টাকার প্রকল্পে রূপ নেওয়া এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

এক সময়ের বেকার তরুণ মিনারের গল্পটি শুরু হয়েছিল স্বপ্ন আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ২০১৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় একটি বইয়ের পাতায় চোখে পড়ে সরকারি একটি উদ্যোগের কথা—যেখানে বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়। সেই তথ্যই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তিনি স্থানীয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে যোগাযোগ করেন এবং ৭২তম ব্যাচে কৃষি ও পশুপালন বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নেন। এই প্রশিক্ষণই তার জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়। কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং কিছু প্রাথমিক উপকরণ পেয়ে ধীরে ধীরে নিজের পথ তৈরি করতে শুরু করেন মিনার।

শুরুটা ছিল একেবারেই ছোট। বাবার দেওয়া ১৪ হাজার টাকা আর সামান্য সহায়তা নিয়ে ১ হাজার ব্রয়লার মুরগির খামার দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু থেমে থাকেননি। ধীরে ধীরে খামার সম্প্রসারণ, ফল গাছ রোপণ এবং মিশ্র কৃষি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি।

আজ তার সেই ছোট উদ্যোগই বিস্তৃত হয়ে প্রায় ১০ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে একটি পরিকল্পিত মিশ্র ফল বাগানে। আম, কাঁঠাল, লিচু, পেঁপে, মাল্টা, জাম্বুরা, নারিকেল, সুপারি, কলা, আনারসসহ প্রায় ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির ফল গাছ রয়েছে এই বাগানে। শুধু ফল গাছই নয়, গাছের ফাঁকে ফাঁকে মৌসুমি সবজি, ধনিয়া, আদা চাষ করে বাড়তি আয় করছেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, টিলার ওপর তার বাড়িকে ঘিরে চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে সবুজের সমারোহ। প্রায় ১২ হাজার ৫০০টিরও বেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে এখানে। পাশাপাশি রয়েছে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির খামার। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ১৯ হাজার ব্রয়লার মুরগি এবং ১ লাখেরও বেশি আনারসের গাছ রয়েছে।

সব মিলিয়ে ১০ বছরের ব্যবধানে মিনারের এই উদ্যোগের আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৯৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। তার এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং পুরো এলাকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

মিনার জানান, তার বাগানে রাসায়নিক সারের ব্যবহার খুবই সীমিত। তিনি বেশি গুরুত্ব দেন জৈব সার ব্যবহারে। গরুর গোবর, কম্পোস্ট সার এবং প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে তিনি ফলের গুণগত মান বজায় রাখছেন। শুষ্ক মৌসুমে গাছের গোড়ায় খড় ও আগাছা দিয়ে আর্দ্রতা ধরে রাখার ব্যবস্থা করেন।

তার মতে, পাহাড়ি লাল মাটিতে আমের উৎপাদন খুব ভালো হয়। তার বাগানের প্রায় ২৩০টি আমগাছে এ বছর প্রচুর ফল ধরেছে। তিনি আশা করছেন, শুধুমাত্র আম বিক্রি করেই কয়েক লাখ টাকা আয় করতে পারবেন।

কৃষি উদ্যোগের পাশাপাশি তিনি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থাও চালু করেছেন। তার গরুর খামারের বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে নিজের রান্নার কাজে ব্যবহার করছেন। ভবিষ্যতে এই গ্যাস স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ করে আরও আয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।

তার এই উদ্যোগ শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এলাকায় প্রায় ৩০টির বেশি ব্রয়লার খামার গড়ে উঠেছে তার অনুপ্রেরণায়। ফলে বহু বেকার যুবক কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। তার খামারে বর্তমানে স্থায়ীভাবে ৮ জন এবং দৈনিক ভিত্তিতে প্রায় ১৮ জন শ্রমিক কাজ করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিনারের বাগান শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, সামাজিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাগানের কাজের মাধ্যমে গ্রামের নারী-পুরুষ উভয়েই আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়, যেমন দরিদ্রদের সহায়তা, বৃক্ষরোপণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন।

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মিনারের উদ্যোগকে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে কীভাবে একটি ছোট উদ্যোগ বড় সাফল্যে পরিণত হতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ মিনার।

তবে এই পথ সহজ ছিল না। করোনা মহামারির সময় তিনি প্রায় ২২ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়েও প্রায় ৫৭ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবুও হাল ছাড়েননি। নিজের দৃঢ় মনোবল আর পরিশ্রম দিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

মিনার মনে করেন, চাকরির পেছনে ছুটে সময় নষ্ট না করে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়া গেলে দেশের বেকার সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তার মতে, সঠিক প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা এবং সরকারি সহায়তা থাকলে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন।

ভবিষ্যতে তিনি তার বাগানে আরও উন্নত ফল চাষের পরিকল্পনা করছেন। বিশেষ করে মাল্টা ও কমলার মতো সম্ভাবনাময় ফসলের চাষ সম্প্রসারণের ইচ্ছা রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, সোলার পাম্প এবং ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ময়নুল ইসলাম মিনারের এই গল্পটি শুধু একটি সফলতার গল্প নয়, বরং এটি একটি অনুপ্রেরণা। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সীমিত সম্পদ দিয়েও কীভাবে বড় কিছু অর্জন করা যায়, তার বাস্তব প্রমাণ তিনি। তার এই সাফল্য নতুন প্রজন্মকে কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মাধবপুরে ৩৫ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বর্ডার কন্ট্রোলে তেল সংকট রোধ সম্ভব: মন্ত্রী

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৩২ ঘণ্টার অভিযানে ৮২ জন আটক

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় বাঁধ নির্মাণে আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঝুঁকিতে বড়লেখা-জুড়ীর বিদ্যুৎ লাইন, বাড়ছে আতঙ্ক

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

মাধবপুরে ৩৫ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বর্ডার কন্ট্রোলে তেল সংকট রোধ সম্ভব: মন্ত্রী

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৩২ ঘণ্টার অভিযানে ৮২ জন আটক

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় বাঁধ নির্মাণে আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঝুঁকিতে বড়লেখা-জুড়ীর বিদ্যুৎ লাইন, বাড়ছে আতঙ্ক

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলায় প্রতিবাদের ঝড়

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হবিগঞ্জে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ডেঙ্গু প্রতিরোধের উদ্যোগ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তেল কারসাজিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ