প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘ দুই দশক আগে ঘটে যাওয়া একটি আলোচিত রাজনৈতিক হামলার মামলায় আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে সিলেটের আদালতপাড়া। সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত-কে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলার শুনানিতে অংশ নিতে সিলেটে হাজির হয়েছেন তিন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি— আরিফুল হক চৌধুরী, জি কে গৌছ এবং লুৎফুজ্জামান বাবর। সোমবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তাদের উপস্থিতি মামলাটিকে নতুন করে জনমনে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তিন আসামি স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে শুনানিতে অংশ নেন। এর আগে তারা বিমানযোগে সিলেটে পৌঁছান এবং সরাসরি আদালতে উপস্থিত হন। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই মামলার অগ্রগতি নিয়ে আগ্রহ ছিল আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। ফলে আদালত চত্বরে এদিন বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়।
মামলার পেছনের ঘটনা ফিরে দেখলে উঠে আসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জ জেলার দিরাইবাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। হঠাৎ গ্রেনেড বিস্ফোরণে পুরো এলাকা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। ঘটনাস্থলেই যুবলীগের এক কর্মী নিহত হন এবং অন্তত ২৯ জন আহত হন। গুরুতর আহতদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজে, যা সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ঘটনার পরপরই দিরাই থানার তৎকালীন এসআই হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার পর ধীরে ধীরে মামলার গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং বিভিন্ন সময় নতুন আসামি যুক্ত হন। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মামলাটির গুরুত্বও বাড়তে থাকে।
পরবর্তীতে ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। এতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জি কে গৌছসহ মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগ গঠনের পর মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়, যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।
এই মামলাটি শুধু একটি অপরাধমূলক ঘটনার বিচার নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত। ২০০০-এর দশকের শুরুতে দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও গ্রেনেড হামলার একাধিক ঘটনা ঘটে, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ওপর হামলার ঘটনাও সেই সময়েরই একটি প্রতিফলন।
আইনজীবীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সময়ের ব্যবধানে অনেক সাক্ষী অনুপস্থিত হয়ে পড়েন, আবার অনেক প্রমাণ সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে যায়। তবুও আদালত প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আদালতে হাজির হওয়ার পর আসামিদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করেছেন, এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই মামলাটি নিয়ে আগ্রহ কম নয়। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া উচিত, যাতে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
সব মিলিয়ে, সিলেটের আদালতে আরিফ-বাবর-গৌছের হাজিরা শুধু একটি নিয়মিত আদালত কার্যক্রম নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই মামলার চূড়ান্ত রায় দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।


