প্রকাশ:২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের তরুণদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, সিলেটে এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালুর বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহ অথবা তার পরের সপ্তাহে আইসিটি উপদেষ্টাকে সিলেটে এনে কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী সমিতির অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ ঘোষণা দেন। সিলেটের তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতায় গড়ে তোলা, ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তাদের সম্পৃক্ত করা এবং দেশ-বিদেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, সঠিক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে সিলেটের বিপুলসংখ্যক তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে তারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ পেতে পারেন। এ জন্য শুধু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন নয়, তরুণদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত শিক্ষা, ব্যবসা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, গবেষণা ও শিল্পসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় সিলেটে এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন ধরনের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সিলেটের অনেক তরুণ ইতোমধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআই-ভিত্তিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ এখনো সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেনি। প্রস্তাবিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হলে স্থানীয় পর্যায়ে সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মন্ত্রী জানান, এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে আইসিটি উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রটির সম্ভাব্য কাঠামো, কার্যক্রম এবং বাস্তবায়ন নিয়ে আরও আলোচনা করতেই আইসিটি উপদেষ্টাকে সিলেটে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহ অথবা তার পরের সপ্তাহে এই সফর হতে পারে বলে তিনি জানান।
তবে কেন্দ্রটি কোথায় স্থাপন করা হবে, কখন থেকে প্রশিক্ষণ শুরু হবে, কী ধরনের কোর্স চালু হবে এবং প্রতি ব্যাচে কতজন প্রশিক্ষণার্থী সুযোগ পাবেন—এসব বিষয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। পরবর্তী আলোচনা ও পরিদর্শনের পর এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এদিকে শুধু প্রযুক্তি দক্ষতা নয়, সিলেটকে বিনিয়োগ ও পর্যটনের জন্য আরও উপযোগী করে তুলতে যোগাযোগব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি শহরের যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন ছাড়া একটি অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশে পরিণত করা কঠিন।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ এবং রেল যোগাযোগ আধুনিকায়নের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত হলে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সিলেটের যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সুবিধা বাড়তে পারে।
সিলেটের অর্থনীতিতে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ সিলেটের প্রাকৃতিক ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণে আসেন। বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ এবং পর্যটনভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও নিরাপদ পরিবেশ ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরবাসীর নিরাপত্তার বিষয়টিও মন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি জানান, সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি এবং রাতের নজরদারি সুবিধাসম্পন্ন উন্নত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে নগরের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমানোর বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, একটি শহরকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় করতে হলে সেখানে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও প্রয়োজন।
প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফেস রিকগনিশন ও সিসিটিভি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন ও নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে নিরাপত্তা বৃদ্ধির পাশাপাশি নাগরিক অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা সম্ভব হবে।
সিলেটে এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দক্ষ তরুণদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তিভিত্তিক ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ গড়ে উঠতে পারে। অনলাইনভিত্তিক সেবা, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, তথ্য বিশ্লেষণ এবং এআই-নির্ভর বিভিন্ন সেবা নিয়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে সিলেট থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথ তৈরি করার সম্ভাবনাও রয়েছে। একজন দক্ষ ফ্রিল্যান্সার দেশের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করলে তার আয় দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে যুক্ত হয়। প্রশিক্ষণ, ইন্টারনেট সুবিধা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
তবে এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান ও বাস্তব কর্মসংস্থানের সঙ্গে এর সংযোগের ওপর। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, আধুনিক সফটওয়্যার ও এআই টুল ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজের প্রস্তুতি থাকলে প্রশিক্ষণার্থীরা বেশি উপকৃত হতে পারেন।
এ কারণে কেন্দ্রটি চালুর পর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, প্রশিক্ষক নির্বাচন কীভাবে হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরিতে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে।
সিলেটকে বিনিয়োগবান্ধব, নিরাপদ ও আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যে লক্ষ্য মন্ত্রী তুলে ধরেছেন, তার সঙ্গে প্রযুক্তি দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগটিও সম্পর্কিত। একদিকে তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে মানবসম্পদ উন্নয়ন, অন্যদিকে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা অবকাঠামোর উন্নয়ন—এই দুই ধারার কার্যক্রম সিলেটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
এখন আইসিটি উপদেষ্টার সম্ভাব্য সিলেট সফর এবং সংশ্লিষ্টদের পরবর্তী আলোচনার দিকে নজর রয়েছে। সেই পরিদর্শনের পর এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবস্থান, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও বাস্তবায়নের সময়সূচি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। সিলেটের তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করার এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষণের মান এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর।


