প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বহু আলোচিত একটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ পর্বে হাজির হয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত তিন ব্যক্তি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সংসদের সরকার দলীয় হুইপ জি কে গউছ এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। তারা সবাই দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয় এবং তারা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকারের আদালতে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালতে হাজির হয়ে আসামিরা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারার অধীনে নিজেদের বক্তব্য প্রদান করেন। এই ধারা অনুযায়ী, মামলার রায়ের আগে আসামিদের বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে তারা নিজেদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী এটিএম ফয়েজ জানান, তার মক্কেলরা আদালতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। লিখিত বক্তব্যের পাশাপাশি মৌখিকভাবেও তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন এবং মামলায় তাদের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ নেই বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখেই তারা আদালতে উপস্থিত হয়েছেন এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছেন।
শুনানি শেষে আদালত চত্বরের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জি কে গউছ। তিনি অভিযোগ করেন, এই মামলার কারণে তাকে দীর্ঘ ২৬ মাস নানা ধরনের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে আদালত নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি বিবেচনা করে সঠিক রায় দেবেন।
এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামলার প্রক্রিয়া নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল হোসেন জানান, আসামিদের বক্তব্য গ্রহণ শেষে আদালত আগামী ২১ এপ্রিল যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তারিখ নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেন, এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের যুক্তি তুলে ধরবে এবং মামলার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
শুনানির দিন আদালত প্রাঙ্গণে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বেলা ১২টার দিকে আরিফুল হক চৌধুরীসহ অন্যান্য আসামিরা আদালতে পৌঁছালে তাদের ঘিরে রাখেন বিপুল সংখ্যক আইনজীবী ও দলীয় নেতাকর্মী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। আদালতের ভেতরেও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়।
এই মামলার পটভূমি দীর্ঘদিনের এবং তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। ২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জের দিরাইবাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। হঠাৎ গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে যুবলীগের এক কর্মী নিহত হন এবং অন্তত ২৯ জন আহত হন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
ঘটনার পর দিরাই থানার তৎকালীন এসআই হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর এই ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় লুৎফুজ্জামান বাবর, আরিফুল হক চৌধুরী এবং জি কে গউছসহ মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলায় ১২৩ জনকে সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা এর গুরুত্ব ও জটিলতার ইঙ্গিত দেয়।
এই মামলাটি শুরু থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আলোচিত। একদিকে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ, অন্যদিকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে এটি জনমনে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মামলার অগ্রগতি, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং শুনানি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মামলায় প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ৩৪২ ধারায় আসামিদের বক্তব্য গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া, যা বিচারককে মামলার বিভিন্ন দিক মূল্যায়নে সহায়তা করে। তারা বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের মামলার মাধ্যমে জনগণের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা আরও দৃঢ় হয়।
এখন মামলাটি যুক্তিতর্কের পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যা এর চূড়ান্ত পরিণতির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আগামী ২১ এপ্রিল নির্ধারিত তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ তাদের চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন করবেন। এরপর আদালত মামলার রায় ঘোষণার জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
সব মিলিয়ে, সিলেটের এই আদালতকেন্দ্রিক ঘটনাটি শুধু একটি মামলার শুনানি নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচারব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের একটি প্রতিফলন। এখন সবার দৃষ্টি আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম এবং চূড়ান্ত রায়ের দিকে, যা এই দীর্ঘমেয়াদি মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।


