প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ কোয়ার্টারে হঠাৎ করে বিরল প্রজাতির ‘কালনাগিনী’ সাপের উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তবে দ্রুত পদক্ষেপ ও সমন্বিত উদ্যোগের ফলে সাপটি নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং পরে সেটিকে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়। ঘটনাটি একদিকে যেমন মানুষের মধ্যে সচেতনতার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দায়িত্বশীল আচরণের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার রাত ৮টার দিকে, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ কোয়ার্টারের তৃতীয় তলায় অবস্থিত শ্রাবণ পালের বাসায়। পরিবারের সদস্যরা হঠাৎ করে ঘরের ভেতরে একটি সাপ দেখতে পান। প্রথমে বিষয়টি তারা বিশ্বাসই করতে পারেননি, কিন্তু সাপটি নড়াচড়া করতে দেখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই পরিবারের সবাই ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। খবরটি দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে অন্য বাসিন্দারাও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে। বাসার সদস্যরা সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসনিমকে অবহিত করা হলে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তিনি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাতে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে নিরাপদে সাপটি উদ্ধার করতে পারে।
খবর পেয়ে বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সাপটির অবস্থান নিশ্চিত করে। প্রায় এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় তারা সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। উদ্ধারকারীরা জানান, এটি ‘কালনাগিনী’ নামে পরিচিত একটি বিরল প্রজাতির সাপ, যা সাধারণত বনাঞ্চলে বসবাস করে এবং লোকালয়ে খুব কমই দেখা যায়।
উদ্ধারের পর সাপটিকে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হক জানান, সাপটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও অক্ষত ছিল। এরপর নিয়ম অনুযায়ী দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি কোনোভাবে আহত হয়নি বা অসুস্থ নয়।
পরবর্তীতে রাতেই সাপটিকে কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জানকিছড়া এলাকায় অবমুক্ত করা হয়। এই উদ্যানটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে বসবাস করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রজাতির সাপের জন্য এই ধরনের বনাঞ্চলই উপযুক্ত আবাসস্থল।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেব বলেন, ‘কালনাগিনী’ সাপ এখন খুব একটা দেখা যায় না। এটি সাধারণত গভীর বনাঞ্চলে থাকে এবং মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। তবে কখনো কখনো পরিবেশগত পরিবর্তন বা খাদ্যের সন্ধানে এটি লোকালয়ে চলে আসতে পারে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই সবচেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল আচরণ।
এই ঘটনার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান। ক্রমবর্ধমান নগরায়ন ও বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়ার কারণে অনেক সময় বন্যপ্রাণী তাদের প্রাকৃতিক আবাস হারিয়ে ফেলে এবং লোকালয়ে চলে আসে। এতে করে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে সচেতনতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সংঘাত অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। প্রতিটি নাগরিকের উচিত বন্যপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় সচেতন থাকা। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে সে বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব। যদি ওই পরিবার আতঙ্কিত হয়ে সাপটিকে হত্যা করার চেষ্টা করত, তাহলে একদিকে যেমন একটি বিরল প্রজাতির প্রাণী হারিয়ে যেত, অন্যদিকে মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হতে পারত।
স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনার পর স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, প্রথমে সবাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরে যখন শুনলেন সাপটি নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে এবং বনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তারা স্বস্তি পান। অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে মোকাবিলার জন্য আরও প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনাটি শুধু একটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা নয়, বরং এটি মানুষের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই টেকসই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।


