প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে। প্রয়োজনীয় শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর অভাবে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগে ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও বাস্তবে সেই উন্নয়ন পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বর্তমানে হাসপাতালটি এখনো ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। এতে করে বাড়তি রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং অনেক সময় রোগীদের মেঝেতে কিংবা অস্থায়ীভাবে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ছয়টি কনসালটেন্ট পদসহ মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন, সিনিয়র স্টাফ নার্স, ফার্মাসিস্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল নেই। ফলে বিদ্যমান চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে এবং তারা রোগীদের যথাযথ সময় ও মনোযোগ দিতে পারছেন না।
এছাড়া সহায়ক কর্মীর সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্বাস্থ্য সহকারী, অফিস সহায়ক, ওয়ার্ড বয়, আয়া ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ঘাটতির কারণে হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর অভাবে হাসপাতালের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে।
চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও রয়েছে চরম দুরবস্থা। জানা গেছে, প্রায় ১৮ বছর ধরে হাসপাতালের এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি মেশিন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে রোগীদের এসব পরীক্ষা করতে বাইরে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও খরচ উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে। জরুরি চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ পরিচালনায়ও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। চিকিৎসক সংকটের কারণে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের দিয়ে জরুরি সেবা পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে করে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
হাসপাতালের যন্ত্রপাতির ঘাটতিও উদ্বেগজনক। বিপি মেশিন, স্টেথোস্কোপ, নেবুলাইজার, পালস অক্সিমিটার, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনায় নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
অবকাঠামোগত দিক থেকেও হাসপাতালটি পিছিয়ে রয়েছে। রোগীবান্ধব পরিবেশের অভাব, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং নিরাপত্তা কর্মীর সংকট হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে তুলেছে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক দিকেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। বাজেট স্বল্পতা, বরাদ্দ বণ্টনের জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে মেরামত কাজ করতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় জরুরি অবকাঠামো উন্নয়নও বিলম্বিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসনিম বলেন, “জনবল সংকটের মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি রোগীদের সেবা দিতে। তবে পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও চিকিৎসকের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় নিয়োগ হলে স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে এবং ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান চিত্র গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বাস্তব প্রতিফলন তুলে ধরে। অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও যদি প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম নিশ্চিত না করা যায়, তবে সেই উন্নয়ন কার্যকর হয় না। এখন সময় এসেছে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।


