প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলায় টানা বর্ষণ ও হাওরের পানির অতিরিক্ত প্রবাহের কারণে প্রায় ৫০০ একর বোরো ধানের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা, যারা বছরের পরিশ্রম ও ঋণের পরিশোধ নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। বানিয়াচং উপজেলার ইকরাম গ্রামের পার্শ্ববর্তী হাওর এলাকায় চৈত্র মাসে ধারাবাহিক বর্ষণের ফলে স্থানীয় কৃষকরা তাদের ফসল রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কৃষক আহ্লাদ মিয়া ঋণ নিয়ে ৮ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন, কিন্তু কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির কারণে তার পুরো জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একইভাবে প্রদীপ চক্রবর্তী ৬ বিঘা জমির ধান হারিয়েছেন। কুটি মিয়া বলেন, ‘চোখের সামনে ফসল তলিয়ে যাবে ভাবিনি, এখন সারা বছর কিভাবে চলব তা বুঝতে পারছি না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, হুগলির হাওরসহ আশপাশের হাওরগুলোতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ না থাকার কারণে প্রতিবছরই এমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তারা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। শুধু বানিয়াচং নয়, বাদেশ্বরা, বালি ও ব্যাঙ্গা হাওরও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যদি আরও ভারি বর্ষণ হয়, তবে হাজার হাজার একর ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সুজাতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাদিকুর রহমান জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বাঁধ উপচে পানি হাওরে প্রবেশ করেছে, যার ফলে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আকতারুজ্জামান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে এবং তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একই অবস্থা লক্ষ করা গেছে লাখাই উপজেলায়। এখানে ১০ থেকে ১২ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। লাখাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ধলেশ্বরী নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলীয় এলাকায় ফসল তলিয়ে গেছে। লাখাইতে মোট ১১ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত জমি মূলত নদীর পাড়ে নিম্নতলা এলাকায় অবস্থিত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হবিগঞ্জ শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: মাসুম চৌধুরী বলেন, লাখাইয়ের কিছু জমি জলবদ্ধতার কারণে পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি জানিয়েছেন, তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয় কৃষকরা মনে করছেন, বন্যা ও অতিবৃষ্টির আগাম পূর্বাভাস ও কার্যকর বাঁধ নির্মাণ ছাড়া ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হননি, বরং পরিবারের দৈনন্দিন জীবন ও ঋণ পরিশোধের চাপেও পড়েছেন। তাঁদের মতে, সরকারের ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া হলে সামান্য হলেও স্বস্তি পাওয়া সম্ভব হবে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় কৃষক সমাজের জন্য শুধু আর্থিক নয়, মানসিক চাপের বিষয়ও হয়ে উঠেছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরাঞ্চলের ফসল বাঁচাতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ, দ্রুত বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার প্রয়োজন। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগতে বাধ্য হবেন।
উপসংহারে বলা যায়, বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলায় টানা বর্ষণ ও হাওরের অতিপ্রবাহে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষতি প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। সরকারের তৎপরতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া হাওরাঞ্চলের কৃষকরা এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার বিপর্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

