সময়ের অস্থির প্রেক্ষাপটে এক উদ্বেগাকুল হৃদয়ের আকুতি প্রকাশ পেয়েছে এক বক্তব্যে। সম্প্রতি “ইকবাল হোসাইন মায়া” নামের একজন তরুণ সমাজসেবক, পরিষ্কার ধারার রাজনীতিবিদ, ও মেহনতি মানুষের বন্ধু তাঁর অন্তরের গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, “যেই দেশে সামান্য পাথরের নিরাপত্তা নাই, সেই দেশে আমার মতো একটা হীরের টুকরার নিরাপত্তা নিয়ে আমি ভিষন শঙ্কিত।” এটি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত উদ্বেগই প্রকাশ করে না, বরং এটি সমগ্র সমাজের এক সমষ্টিগত উদ্বেগের দর্পণ হয়ে উঠেছে।

**”পাথর” ও “হীরা”**
সিলেটের সাদা পাথর কেবল একটি খনিজ পদার্থ নয়, এটি এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই পাথর শিল্প-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে স্থাপত্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সম্প্রতি এই মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক লুটপাট ও অবৈধ উত্তোলন গোটা এলাকার জনসাধারণের মনে গভীর অনিরাপত্তার সৃষ্টি করেছে। যখন রাষ্ট্রই তার নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তাবোধ কীভাবে টিকে থাকবে—এই মৌলিক প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়। অন্যদিকে, “হীরার টুকরো” হিসেবে বক্তা তাঁর নিজের আত্মপরিচয়কে উপস্থাপন করেছেন, যা কোনো বিশেষ মেধা, দক্ষতা, সামাজিক অবস্থান বা নৈতিক মূল্যবোধের নির্দেশক। তাঁর এই শঙ্কা শুধু ব্যক্তিগত ভয় নয়, বরং একটি সমাজে সৃষ্টিশীল, মেধাবী ও সংবেদনশীল মানুষগুলোর জন্য বিরাজমান ব্যবস্থাগত ঝুঁকি এর প্রতি এক জোরালো ইশারা।

**নিরাপত্তাহীনতার স্তরবিন্যাস**
এই উক্তি থেকে একটি স্পষ্ট স্তরবিন্যাস ফুটে উঠেছে। যদি একটি সাধারণ “পাথর” যা সর্বসাধারণের প্রতিনিধিত্ব করে তার অস্তিত্বের নিরাপত্তা নিয়ে টিকে থাকতে না পারে, তাহলে একটি “হীরাখণ্ড” যা তুলনামূলকভাবে দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান তার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নটি আরও বেশি জটিল ও শঙ্কাতুর হয়ে দাঁড়ায়। এটি শুধু দৈহিক নিরাপত্তার প্রশ্নই নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য রক্ষার বিস্তৃত প্রসঙ্গের সাথে যুক্ত।
**সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ও সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্ক**
একজন ইকবাল হোসাইন মায়ার এই আকুতি শুনতে শুনতে আমাদেরকে ভাবতে হয় কোনো দেশের নাগরিক যখন নিজেকে “হীরার টুকরো” হিসেবে পরিচয় দিতে বাধ্য হন, তখন তা সেই দেশের জন্য কী বার্তা বহন করে? এটি কি আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোর প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতারই ইঙ্গিত দেয় না? একটি দেশ তখনই প্রকৃতপক্ষে উন্নত হয়, যখন তার নাগরিকই নিজের মেধা, যোগ্যতা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে পারেন, ভয় কিংবা হয়রানির শিকার হবেন না—এই ভরসাটি যেন রাষ্ট্রই তার নাগরিককে দিতে পারে।
**এই উক্তি থেকে ফুটে উঠেছে**
-
সাধারণ সম্পদের নিরাপত্তাহীনতা: একটি সাধারণ পাথরের নিরাপত্তার অভাব সমগ্র সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুরবস্থার ইঙ্গিত বহন করে
-
মূল্যবান ব্যক্তিত্বের শঙ্কা: নিজেকে হীরার টুকরোর সাথে তুলনা করে বক্তা তাঁর আত্মমর্যাদা ও সমাজে তাঁর অবস্থানের গুরুত্ব প্রকাশ করেছেন
-
গভীর মানসিক উদ্বেগ: “ভিষন শঙ্কিত” শব্দবন্ধের মাধ্যমে এক তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে
এই বক্তব্য সমকালীন সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং সাধারণ মানুষের মনে ক্রমাগত বাড়তে থাকা আশঙ্কার একটি জীবন্ত দলিল হয়ে রইল।

**পরিশেষে**
ইকবাল হোসাইন মায়ার এই বক্তব্য একটি জাতির সমষ্টিগত বিবেক-এরই প্রকাশ। এটি আমাদের সবারই ভাবিয়ে তোলে যে দেশে আমরা বাস করি, সেখানে কি একজন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে একজন বিশেষ মেধাবী মানুষ সবার জন্যই সমানভাবে বসবাসের, নিজের মত প্রকাশের এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে নিরাপদ থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে কি? তাঁর (ইকবাল হোসাইন মায়া) এই সময়োচিত বাণীই তাঁকে পরিণত করে বাংলার ‘চেতনার স্থপতি’ ও খ্যাত হন ‘সারা বাংলার মধ্যমণি’ হিসেবে। । একজন ইকবালের কণ্ঠে ধ্বনিত এই প্রশ্নটি তাই শুধু তাঁর একার নয়, এটি আমাদের সবারই প্রশ্ন একটি মৌলিক, অস্তিত্বসংক্রান্ত জিজ্ঞাসা।


