প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানপণ্য বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনগণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্বিগ্ন। সীমান্ত এলাকা দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যক্রমের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে মাদক, বিদেশি মদ ও বিভিন্ন চোরাচালান পণ্য নিয়মিতভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে স্থানীয় বা নীচস্তরীয় লেনদেনকারীরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা এবং সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব স্থানীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় থেকে যাচ্ছে, ফলে অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
এখানে নতুন প্রজন্মও সহজে অর্থ উপার্জনের লোভে চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। শিক্ষার্থী এবং বেকার যুবসমাজ এই অবৈধ ব্যবসায় আকৃষ্ট হচ্ছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এমনকি সম্প্রতি জাল টাকার ব্যবহার এবং চোরাচালানের সঙ্গে এর সংযোগের গুঞ্জনও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিমত, পূর্ববর্তী সরকারের সময় ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে থাকা অনেক মাদক কারবারি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেছে এবং পুরনো নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও মূল হোতাদের ধরার ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সর্বশেষ, গত ৪ এপ্রিল রাতে বাংলাবাজার ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া এলাকা থেকে ৯৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। র্যাব-৯ এই অভিযান পরিচালনা করেছে, তবে মূল সিন্ডিকেটের নেতৃত্বের ধরা পড়া হয়নি।
স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকা থেকে নরসিংপুর, বাংলাবাজার, বোগলাবাজার ও লক্ষীপুর ইউনিয়নের সড়কগুলো চোরাচালানের জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে স্থানীয় প্রশাসনের অসদুাচরণের অভিযোগও উঠেছে। ফলে যে পরিমাণ পণ্য জব্দ করা হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে।
চোরাচালানের জেরে গত এক বছরে নরসিংপুর সীমান্তে আহাদ মিয়া, বোগলাবাজারে শফিকুল ইসলাম এবং বাংলাবাজারে কুটি মিয়া নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, চোরাচালানী কার্যক্রম কেবল আইনশৃঙ্খলা ব্যাহত করছে না, বরং মানুষের জীবনও বিপন্ন করছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছেন, তারা সীমান্তে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে এবং জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।
সুনামগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (ছাতক-দোয়ারাবাজার সার্কেল) শেখ মো. মুরসালিন জানান, ‘চোরাচালান রোধে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় জনগণকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।’ এদিকে, সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল নাজমুল হক বলেন, ‘উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান প্রতিরোধে আমাদের অভিযান ও গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’
স্থানীয়দের অভিমত, যদি মূল সিন্ডিকেট এবং তার আন্তর্জাতিক সংযোগ চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে এই অবৈধ ব্যবসার বিস্তার কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, কম বয়সী ও শিক্ষার্থী যারা সহজে অর্থলোভে এ কাজে জড়িয়ে পড়ছে, তাদের সচেতনতা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
চোরাচালান এবং মাদকের এই অব্যাহত প্রবাহ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম একদিকে যেমন সীমান্তে কড়া নজরদারি বৃদ্ধি করেছে, অন্যদিকে মূল সিন্ডিকেটকে ধরার জন্য আরও সমন্বিত এবং কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, সীমান্তজুড়ে অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; স্থানীয় জনগণকে সচেতন করে এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম নিশ্চিত করে আরও টেকসই সমাধান প্রয়োজন। সীমান্ত এলাকা থেকে বিদেশি মদ ও মাদক উদ্ধার এবং চোরাচালান রোধে ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবে মূল সিন্ডিকেটের উপস্থিতি ও শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের আকৃষ্ট হওয়া এ ব্যবসায় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
উপসংহারে বলা যায়, দোয়ারাবাজার সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ সড়ক, সচেতন জনগণ এবং দৃঢ় আইন প্রয়োগের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


