প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন শাহ সৈয়দ শদাই মাজার আজ ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে টিকে থাকার লড়াই করছে। সময়ের সাক্ষী এই ঐতিহ্যবাহী মাজার ও সংলগ্ন মসজিদটি এখন প্রকৃতির নির্মম আগ্রাসনের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের চোখের সামনে ধীরে ধীরে নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস, স্মৃতি এবং ধর্মীয় আবেগের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের পনাইচক গ্রামে অবস্থিত এই মাজারটি বহু বছর ধরে কুশিয়ারা নদীর ভাঙনের ঝুঁকিতে ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় পরিস্থিতি এখন সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইতোমধ্যেই মাজারের সীমানা প্রাচীরের বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, মাজারে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটিও নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন নদীর পাড় ধসে পড়ছে এবং নতুন নতুন ফাটল দেখা দিচ্ছে। মাজারের পাশেই থাকা মসজিদটিও একই ঝুঁকিতে রয়েছে। আশপাশের বসতবাড়ি, মাদ্রাসা ও অন্যান্য স্থাপনাও এখন ভাঙনের হুমকিতে। ফলে পুরো এলাকা এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
মাজারের খাদিম শামসুল ইসলাম গেদাই বলেন, বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেরি হয়েছে। তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ এলাকা পরিদর্শন করলেও দীর্ঘদিন কাজ শুরু হয়নি। প্রায় ৩০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হলেও ঠিকাদার সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন আটকে ছিল। তার আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে খুব শিগগিরই মাজার ও মসজিদ পুরোপুরি নদীগর্ভে চলে যাবে।
এই মাজার শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং এটি স্থানীয় মানুষের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এলাকার বাসিন্দা জেড রহমান জুনু বলেন, “এই মাজার আমাদের জন্য গর্বের জায়গা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে, মানত করে, দোয়া করে। এখন মনে হচ্ছে আমরা চোখের সামনে আমাদের ইতিহাস হারিয়ে ফেলছি।” তার কথায় ফুটে ওঠে এক ধরনের অসহায়ত্ব এবং গভীর উদ্বেগ।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার। গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৫০ মিটার এলাকায় প্রতিরোধমূলক কাজের জন্য ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে।
একইভাবে, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, এই মাজার অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নিদর্শন। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কুশিয়ারা নদীর ভাঙন নতুন কিছু নয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু অস্থায়ী বাঁধ বা বালুর বস্তা দিয়ে কাজ চালালে দীর্ঘমেয়াদে সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিকল্পিত ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের একটাই দাবি—দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা। তারা চান, শুধু মাজার নয়, পুরো এলাকার স্থাপনাগুলো রক্ষায় স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা হোক। কারণ প্রতিটি দিন দেরি মানেই আরও কিছু জমি, আরও কিছু ইতিহাস নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া।
সব মিলিয়ে, কুশিয়ারার ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে থাকা এই প্রাচীন মাজার শুধু একটি স্থাপনার সংকট নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য রক্ষার চ্যালেঞ্জেরও প্রতীক। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায় এবং ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশকে রক্ষা করা সম্ভব হয় কি না।


