প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় বাবা-মেয়েসহ একই পরিবারের তিনজনকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় শত শত মানুষ চুনারুঘাট থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের বগাডুবী রেললাইনের মোড়ে ঘটনাটি ঘটে। পরে দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা ও উত্তেজনা তৈরি হয়। বিকেল ৪টার দিকে সংশ্লিষ্ট তিনজনকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী হিসেবে যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের কালিশিরী গ্রামের ছায়েদ আলী, তাঁর মেয়ে জাসমিন আক্তার এবং ছায়েদ আলীর ভাই ইউনুস মিয়া। ছায়েদ আলীর বয়স ৫০ বছর, জাসমিন আক্তারের ২৪ বছর এবং ইউনুস মিয়ার বয়স ৪৫ বছর বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কালিশিরী গ্রামের একটি পরিবারের সঙ্গে ছায়েদ আলীর দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। স্থানীয়ভাবে ওই পরিবারটি ‘কারী সাব’ নামে পরিচিত বলে জানা গেছে। নারীসংক্রান্ত বিষয় এবং রাস্তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিক মামলা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে ১০ থেকে ১২টি মামলা চলমান রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে একটি মামলায় হাজিরা দেওয়ার জন্য ছায়েদ আলী তাঁর মেয়ে জাসমিন আক্তার ও ভাই ইউনুস মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ইজিবাইকে করে চুনারুঘাটের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বগাডুবী রেললাইনের মোড়ে পৌঁছালে তাদের ইজিবাইকের গতিরোধ করা হয় বলে অভিযোগ করেন ছায়েদ আলী।
ছায়েদ আলীর অভিযোগ, এসআই মামুনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাঁদের ইজিবাইক থামিয়ে তল্লাশি চালায়। এ সময় তাঁদের বিরোধী পক্ষের কয়েকজন লোকও পুলিশের সঙ্গে ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তল্লাশির একপর্যায়ে তাঁদের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন ছায়েদ আলী।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত তিনজনকে পুলিশের গাড়িতে করে চুনারুঘাট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিষয়টি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে কালিশিরী গ্রামের মানুষজনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে বিপুলসংখ্যক গ্রামবাসী থানার সামনে জড়ো হয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
স্থানীয়দের এই বিক্ষোভের সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় ব্যক্তিরাও থানায় উপস্থিত হন বলে জানা গেছে। বিএনপির কয়েকজন নেতা এবং আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কয়েকজন থানায় গিয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। একপর্যায়ে পুলিশ ছায়েদ আলী, তাঁর মেয়ে জাসমিন এবং ভাই ইউনুসকে ছেড়ে দেয়।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে তিনজনকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করা হয়নি। চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ওসি বলেন, ঘটনাটি যদি সাজানো হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে এসআই মামুনসহ যেসব পুলিশ সদস্যের নাম অভিযোগের সঙ্গে এসেছে, তাঁদের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনাটি ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তিনজনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের আটক করা হয়েছিল, তার পেছনে প্রকৃত ঘটনা কী ছিল। পুলিশ দাবি করছে, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অন্যদিকে ছায়েদ আলীর পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। ফলে তদন্তের ফলাফল না আসা পর্যন্ত কোনো পক্ষের অভিযোগকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের বিরোধ ও একাধিক মামলা চলমান থাকার কারণে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ উঠলে তা সহজেই নতুন করে বিরোধ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে পুলিশের মতো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
অভিযোগকারী ছায়েদ আলীর জন্য ঘটনাটি পারিবারিকভাবেও উদ্বেগের হয়ে উঠেছে। তাঁর সঙ্গে তাঁর ২৪ বছর বয়সী মেয়ে ও ভাইকেও একই ঘটনায় আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একটি মামলায় হাজিরা দিতে যাওয়ার পথে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার দাবি তাঁদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভ এবং পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে, মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় এ ধরনের ঘটনায় সঠিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়। মাদকদ্রব্য উদ্ধার, তা কার কাছ থেকে পাওয়া গেছে, কোথায় পাওয়া গেছে, তল্লাশির প্রক্রিয়া কী ছিল এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে পুলিশের বিরুদ্ধে যে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে, সেটিও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য স্বচ্ছ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগ অসত্য বা সাজানো প্রমাণিত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। চুনারুঘাট থানার ওসির বক্তব্যেও তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ, আটক করার সময় কী ঘটেছিল এবং ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে পুলিশের প্রাথমিক অবস্থান কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হতে পারে।
চুনারুঘাটের এই ঘটনা একই সঙ্গে স্থানীয় বিরোধ, মাদকবিরোধী আইন প্রয়োগ এবং পুলিশের জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক মামলা চলমান থাকায় ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো ঘটনা যাতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি না করে, সেদিকেও প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও গুজব বা একতরফা তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের পক্ষ থেকে এসআই মামুনসহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তদন্তের কথা জানানো হয়েছে। সেই তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং আটকের প্রক্রিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ।
এদিকে, বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর তিনজনকে ছেড়ে দেওয়ায় তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। তবে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের পক্ষপাতের সুযোগ না রেখে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া।


