প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে ফের ছড়িয়ে পড়েছে নতুন সংঘাতের অগ্নিশিখা। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দেব প্রণালি থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোয় নতুন করে ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের ভয়াল কালো মেঘ। আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে উত্তপ্ত করে ইয়েমেনের বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠন হুতি গোষ্ঠী সরাসরি সৌদি আরবের হৃদপিণ্ড ও রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভবনে চাঞ্চল্যকর হামলা চালানোর সুনির্দিষ্ট দাবি করেছে। শুধু রাজধানীর সংবেদনশীল সামরিক অবকাঠামোই নয়, বরং সৌদি আরবের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ইয়ানবুতে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর বিশাল স্থাপনাতেও একযোগে ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি তুলেছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই সংকটের বিস্তারিত তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
বৃহস্পতিবার ইয়েমেন থেকে হুতি গোষ্ঠীর সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি এক জরুরি টেলিভিশন বার্তার মাধ্যমে তাদের এই সুপরিকল্পিত ও হাই-প্রোফাইল সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। স্যাটেলাইট ও টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ওই বিশেষ সামরিক বার্তায় হুতি মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি জোর দিয়ে দাবি করেন যে, তাদের অত্যাধুনিক ড্রোন বহর ও সুনির্দিষ্ট দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রাজকীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভবনে সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। একই অভিযানে সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের অন্যতম কৌশলগত শিল্পনগরী ইয়ানবুর কৌশলগত তেল সরবরাহ কেন্দ্র আরামকো ডিপোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল সামরিক উসকানি ও বিস্ফোরণের দাবির জবাবে রিয়াদ সরকার বা সৌদি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি। সৌদির তরফ থেকে কোনো সরাসরি বিবৃতি না পাওয়া গেলেও এটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
হুতি সামরিক মুখপাত্রের এই চাঞ্চল্যকর দাবির পরপরই সৌদি জোটের আকাশ প্রতিরক্ষা বিভাগের সূত্রে বেশ কিছু সমান্তরাল তথ্য সামনে উঠে আসে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামরিক জোটের বরাত দিয়ে জানানো হয় যে, রাজধানী রিয়াদ এবং কৌশলগত বন্দরনগরী ইয়ানবুর পার্শ্ববর্তী পবিত্র নগরী মদিনার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি সন্দেহজনক ও বিস্ফোরকবাহী চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোন আকাশেই সফলভাবে শনাক্ত ও বিধ্বস্ত করা হয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঝপথেই সেগুলোকে ভূপাতিত করে সম্ভাব্য বড় ধরনের ধ্বংসলীলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে রক্ষা করতে পেরেছে বলে সামরিক জোটের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আকাশসীমায় ড্রোন শনাক্ত ও ভূপাতিত করার এই জোরালো ঘটনাটি সরাসরি প্রমাণ করে যে, ভূখণ্ডটির ওপর হুতিদের এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা অত্যন্ত বাস্তব ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।
এদিকে রিয়াদ ও ইয়ানবুতে হামলা এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে সামরিক উত্তেজনার পারদ হু হু করে বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব বাজারে ব্যাপক ধাক্কা লাগার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হুতিদের অব্যাহত আকাশপথের আক্রমণ ও নজিরবিহীন উসকানির মুখে দেশের কৌশলগত অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পূর্ব সতর্কতামূলক বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সৌদি আরবের সর্বপ্রধান ও বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘সৌদি আরামকো’ তাদের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে অবস্থিত বিশাল ও সুরক্ষিত প্রধান কার্যালয় দ্রুত খালি করার প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করেছে। উদ্ভূত নিরাপত্তাহীনতা ও স্পর্শকাতর সামরিক পরিস্থিতির কারণে কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সদর দফতর ফাঁকা করার এই জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়। রয়টার্সের অনুসন্ধান ও ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছয়টি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সূত্র এই অভূতপূর্ব ও সংকটময় পদক্ষেপের সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত করেছে।
ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যকার এই নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সংঘাতের শেকড় বহুদূর বিস্তৃত। ২০১৫ সাল থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের নির্বাচিত ও বৈধ সরকারকে পুনরায় দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সমাসীন করতে সামরিকভাবে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে সৌদি আরব ও তার নেতৃত্বাধীন সুসংগঠিত আঞ্চলিক জোট। গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ও লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। হুতি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি নিজেদের দখলে নিয়ে সেখানে সৌদি আরবের বাণিজ্যিক ও সামরিক নৌযানের ওপর একতরফা নৌ-অবরোধ জারি করার পর থেকেই দুই পক্ষে পুরোদমে নতুন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বিস্ফোরণ ঘটে।
টেলিভিশন বার্তায় হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি তাদের এই সাম্প্রতিক বিধ্বংসী ও সুদূরপ্রসারী হামলার কারণ ও প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সৌদি জোটের পূর্ববর্তী সামরিক অভিযানের বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করে জানান যে, চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যভাগ থেকে ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌদি সামরিক জোটের ব্যাপক ও নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলায় ইয়েমেনের প্রায় ৫৬২ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধা নিহত এবং মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। ইয়েমেনি ভূখণ্ডে সৌদির ওই ধারাবাহিক বিমান হামলা এবং সমুদ্রপথে হুতিদের নৌ-অবরোধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের নিরাপত্তা দৃশ্যপট চরম বিশৃঙ্খল রূপ নেয়। ওই হামলার প্রতিশোধস্বরূপ এবং তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অংশ হিসেবেই রিয়াদে অবস্থিত দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও আরামকো স্থাপনাকে লক্ষ্য করে এবার সরাসরি পাল্টা আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেছে হুতি বিদ্রোহীরা, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত ও ভয়াবহ যুদ্ধের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

