প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ভারতের আসাম এবং উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বসতবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে নির্বিচারে ভাঙচুর চালানো এবং তাদের মৌলিক মানবাধিকার হরণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। দলটির আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী এক গণমাধ্যমে পাঠানো বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বর্তমান পরিস্থিতিকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জাতিগত নিধনের ভয়াবহ রূপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আসামের মতো অঞ্চলে হাজার হাজার মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করে তাদের ঐতিহাসিক মসজিদ ও বাসস্থান মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার খবরটি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের পক্ষ থেকে এই ধরনের উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞকে পরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে তা বন্ধ করার আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে ভারতের আসামে অতি সম্প্রতি বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর এক হাজার একশরও বেশি ঘরবাড়ি এবং প্রায় ১০টিরও বেশি প্রাচীন ও আঞ্চলিক মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত প্রায় এক দশকে উক্ত অঞ্চল থেকে অন্তত ১৯ হাজার পরিবারকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অমানবিক উপায়ে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বর্তমান বিজেপি শাসিত সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সে দেশের মুসলিম ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় মুছে ফেলার দূরভিসন্ধিতে মেতে উঠেছে। বিগত বছরগুলোতে সংঘটিত এসব দমন-পীড়ন পর্যালোচনা করে একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন প্যানেল নিশ্চিত করেছে যে, উত্তরপ্রদেশ ও আসামের মতো রাজ্যগুলোতে শাসক শ্রেণি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও জাতিগত নির্মূলের পথ সুগম করছে। প্যানেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে পদ্ধতিগতভাবে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে এবং প্রশাসনিকভাবে তাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রধান আরও মনে করিয়ে দেন যে, ভারতীয় উপমহাদেশে শত শত বছর ধরে মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে টিকে ছিল। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি বাস্তবায়নের নেশায় আচ্ছন্ন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ভারতকে কেবল একটি ধর্মভিত্তিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার দূরভিসন্ধি নিয়ে এগোচ্ছে। সেই উদ্দেশ্যে একের পর এক ঐতিহাসিক ওয়াকফ সম্পত্তি, প্রাচীন মসজিদ এবং মুসলিম ঐতিহ্যের ধারক-বাহক নিদর্শনগুলোকে হয় দখল করা হচ্ছে, নতুবা কোনো প্রকার আইনি বাধ্যবাধকতা না মেনে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ১৯৯২ সালের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কলঙ্কিত অধ্যায় দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রবণতা বর্তমানে আরও ভয়ঙ্কর ও উন্মুক্ত রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সমাজ ও বিশ্বজুড়ে চলা সমালোচনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তারা একের পর এক ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় আরও উঠে এসেছে দিল্লির একেবারে প্রাণকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক এক চরম অমানবিকতার চিত্র। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের ঠিক কাছাকাছি অবস্থিত প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদের বিরুদ্ধে মোদি প্রশাসন সম্প্রতি কঠোর উচ্ছেদ নোটিশ জারি করেছে। সত্তরের দশক থেকে সরকারি গেজেটভুক্ত এবং নয়াদিল্লির মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের স্বীকৃত ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা এই শতবর্ষী মসজিদটি খালি করে দেওয়ার জন্য মাত্র কয়েক দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। নোটিশ জারির পাশাপাশি মসজিদটির বিদ্যুৎ এবং পানীয় জলের সমস্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। ফলে সেখানে আগত সাধারণ মুসল্লিরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং তাদের দৈনন্দিন ইবাদত-বন্দেগিসহ মানবিক স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে থমকে গেছে। বিচারব্যবস্থা ও সরকারি কাঠামোর এমন একতরফা আচরণ মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
একই সাথে ভারতের নানা প্রান্তে মুসলিমদের ভোটার তালিকা থেকে রহস্যজনকভাবে নাম বাদ দিয়ে তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে, যা সরাসরি তাদের জাতীয় সুরক্ষা ও নাগরিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার একটি সূক্ষ্ম প্রশাসনিক ছক। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাষ্ট্র স্বয়ং যখন তার নাগরিকদের সুরক্ষাহীন করে তোলে, তখন তা সভ্য সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণ মানুষের মাথার ছাদ কেড়ে নিয়ে, ছোট ছোট শিশুদের গৃহহীন করে এবং খোলা আকাশের নিচে ফেলে রেখে প্রশাসন যে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে, তা চরম নির্মমতা ও অন্যায়ের বহিঃপ্রকাশ। নিজ দেশে পরবাসী বানিয়ে রাখার এই নোংরা রাজনীতি শুধু সংশ্লিষ্ট অঞ্চল নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে বিশিষ্টজনরা মনে করছেন।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির দ্রুত অবসানে এবং ভারতের কোটি কোটি নিরপরাধ সংখ্যালঘু মুসলিমের মর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিশ্ব নেতাদের জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা ও হস্তক্ষেপ চেয়েছে খেলাফত আন্দোলন। বিজ্ঞপ্তিতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয় যে, ক্ষমতার দাপটে অগণিত মজলুম মানুষের ওপর যদি এই অমানবিক অত্যাচার অনবরত চালিয়ে যাওয়া হয়, তবে ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় এই ধরনের শাসক ও তাদের উগ্রবাদী নীতি চরম বিপর্যয়ের মুখমুখী হবে। অন্যায়-অবিচারের এই পরিণতি কখনো শুভ হতে পারে না এবং দমন-পীড়নের ফলে সৃষ্টি হওয়া অসন্তোষ ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকেও মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে। ইতিহাস প্রমাণ করে যে, নিপীড়কের সাম্রাজ্য ভেঙে ছারখার হয়ে গেলেও সততা, সহনশীলতা ও বিশ্বাসের ন্যায়ভিত্তিক শক্তির পুনর্বাসন সুনিশ্চিত হয়।


