প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন আজ বিজয়া দশমী। ছয় দিনের পূজা, আনন্দ, প্রার্থনা ও মিলনমেলার পর এবার দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর পালা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সিলেট নগরীসহ জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আজ সকাল থেকেই শুরু হয়েছে বিদায়ের প্রস্তুতি। উৎসবের শেষ দিনে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতি, পূজার আনুষ্ঠানিকতা, সিঁদুর খেলা এবং প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে সিলেটের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দশমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে দেবীর চরণে সিঁদুর অর্পণ করে তাঁর মঙ্গল কামনা করেন নারীরা। এরপর তাঁরা পরস্পরের কপালে ও মুখে সিঁদুর লাগিয়ে অংশ নেন ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায়। আনন্দ, শুভকামনা ও আবেগের মিশেলে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁরা দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নেন। উৎসবের শেষ দিনের এই পরিচিত দৃশ্য একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে তেমনি প্রিয়জনকে বিদায় জানানোর বেদনায় ভরা।
সিলেটের রামকৃষ্ণ মিশনসহ নগরীর কয়েকটি পূজামণ্ডপে নারীদের সিঁদুর খেলায় অংশ নিতে দেখা গেছে। লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো এবং ছবি তোলার মধ্য দিয়ে অনেকেই উৎসবের শেষ মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখার চেষ্টা করেন। পূজার কয়েকটি দিন ধরে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে যে আনন্দ ভাগাভাগি হয়েছে, দশমীর দিনে তারই আবেগঘন পরিসমাপ্তি ঘটে। দেবীর বিদায়কে ঘিরে অনেকের মনে যেমন পরবর্তী বছরের অপেক্ষা তৈরি হয়, তেমনি উৎসবের ব্যস্ততা শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়।
সিলেট নগরীতে প্রতিমা বিসর্জনের প্রধান আয়োজনের একটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে চাঁদনীঘাট এলাকায়। বিকেলে সেখানে প্রতিমা বিসর্জন পর্ব শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে সকাল থেকেই প্রতিমা বিদায়ের প্রস্তুতি চলতে থাকে। বিসর্জনের জন্য প্রতিমা বহন, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা এবং ভক্তদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দিনের শেষ পর্ব এগিয়ে যাবে। তবে বিসর্জন আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ, নির্ধারিত স্থানে চলাচল এবং ভিড়ের মধ্যে সতর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিজয়া দশমী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়; এটি আনন্দের সঙ্গে বিচ্ছেদের অনুভূতি মিশে থাকারও একটি বিশেষ সময়। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে ভক্তরা পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা ও নানা আয়োজনে অংশ নেন। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সেই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। দেবীকে বিদায় জানানোর সময় ভক্তরা পরিবার, সমাজ ও সবার কল্যাণ কামনা করেন। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার যে বার্তা দুর্গোৎসবের সঙ্গে যুক্ত, তা বিজয়া দশমীর আবেগ ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়।
এর আগে মঙ্গলবার মহানবমীর দিন সিলেট নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকে পূজামণ্ডপে গিয়ে অঞ্জলি দেন, ভোগ নিবেদন করেন এবং দেবীর কাছে নিজেদের ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করেন। সন্ধ্যায় পূজা ও আরতির আয়োজনেও অংশ নেন ভক্তরা। নবমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর থেকেই মণ্ডপগুলোতে বিদায়ের আবহ তৈরি হতে থাকে। উৎসবের শেষ দিনের অপেক্ষায় থাকা ভক্তদের কাছে মহানবমীর রাত ছিল আনন্দ ও আবেগের এক বিশেষ মুহূর্ত।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী ও মহানবমীর পূজা-অর্চনা, আরতি, দর্শনার্থীদের আনাগোনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসব এগিয়ে আসে বিজয়া দশমীতে। ছয় দিনের এই আয়োজনকে ঘিরে পূজামণ্ডপগুলোতে সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ভক্তদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিও দুর্গোৎসবকে সামাজিক মিলনমেলার রূপ দেয়। অনেক পরিবারে পূজার দিনগুলোতে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শন করার রীতি রয়েছে।
এবার সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৬৩৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেট জেলায় সর্বজনীন ৪৪৮টি এবং পারিবারিক উদ্যোগে ২৬টিসহ মোট ৪৭৪টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে সিলেট মহানগর এলাকায় সর্বজনীন ১৪৬টি এবং পারিবারিক উদ্যোগে ১৬টিসহ মোট ১৬২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। জেলা ও মহানগর মিলিয়ে এই বিপুলসংখ্যক মণ্ডপে পূজার আয়োজন সিলেটে দুর্গোৎসবের ব্যাপকতা তুলে ধরে।
বিভিন্ন মণ্ডপে আয়োজিত পূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়। পূজার দিনগুলোতে অনেক দর্শনার্থী প্রতিমা দেখতে বের হন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান এবং উৎসবের পরিবেশ উপভোগ করেন। আয়োজকদের জন্যও এই সময়টি দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। বিজয়া দশমীতে সেই পরিশ্রমের শেষ অধ্যায় শুরু হয় প্রতিমা বিদায় ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।
উৎসবের শেষ দিনে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রতিমা বিসর্জনের সময় ঘাট ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়তে পারে। এ কারণে আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন। শিশু ও বয়স্কদের সঙ্গে থাকা, ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি এড়িয়ে চলা এবং বিসর্জনস্থলে সতর্ক অবস্থান নেওয়া সবার নিরাপত্তার জন্য সহায়ক। একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্বও সবার।
বিজয়া দশমীর বিদায়বেলায় সিলেটের পূজামণ্ডপগুলোতে তাই একসঙ্গে ধরা পড়ছে আনন্দ, আবেগ ও প্রত্যাশার ছবি। দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। মণ্ডপের আলোকসজ্জা ধীরে ধীরে নিভে যাবে, উৎসবের ব্যস্ততা কমে আসবে, আর ভক্তরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ কাজে। তবে পূজার দিনগুলোর স্মৃতি, একসঙ্গে কাটানো সময় এবং শুভশক্তির প্রত্যাশা থেকে যাবে তাঁদের মনে। বিদায়ের এই মুহূর্তেই অনেকের মনে ফিরে আসবে আগামী বছরের দুর্গোৎসবের অপেক্ষা—আবারও নতুন সাজে মণ্ডপ, প্রার্থনা, আনন্দ আর মিলনের দিনগুলোর প্রত্যাশা নিয়ে।


