প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা বললেই বিশ্বজুড়ে কালজয়ী বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের নাম অনুরণিত হয়। যে মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন দেহতত্ত্ব, মাটির টান আর জীবন দর্শনে ভরা সুরের জাদুকর করিম, সেই একই মাটিতে এবার সুরের ধারায় নেমে এসেছে অনাকাঙ্ক্ষিত স্তব্ধতা। স্থানীয় একশ্রেণীর বাসিন্দার আপত্তির মুখে বন্ধ করে দিতে হয়েছে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি ঐতিহ্যবাহী বাউল গানের আসর। বাউল সংস্কৃতি ও লোকসংগীতের সূতিকাগার হিসেবে সুপরিচিত একটি জনপদে হঠাৎ নারী সুরসাধকদের গান গাওয়া নিয়ে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া এবং সেই সূত্রে পুরো অনুষ্ঠানটি ভেস্তে যাওয়ার ঘটনায় সুশীল সমাজ ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মাঝে গভীর উদ্বেগ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানে জানা যায়, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে এই বাউল গানের আয়োজন করেছিলেন শওকত আলী নামের স্থানীয় এক যুক্তরাজ্য প্রবাসী। প্রবাসে থাকলেও নিজের শেকড় ও গ্রামের মানুষের বিনোদনের কথা চিন্তা করে তিনি বৃহস্পতিবার এই গানের আসরের দিনক্ষণ নির্ধারণ করেছিলেন। আয়োজনটিকে স্মরণীয় ও সর্বজনীন করে তুলতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল দুই জনপ্রিয় নারী বাউল শিল্পী তানিশা ও নিলাকে। অনুষ্ঠানটি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়েছিল এবং আয়োজক শওকত আলী পুরো এলাকায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও পোস্টারিংয়ের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। স্থানীয় সংগীতপ্রেমীরা যখন বাউলের ভাবরসে বুঁদ হওয়ার প্রহর গুণছিলেন, ঠিক তখনই ঘনীভূত হয় অনিশ্চয়তার মেঘ।
অনুষ্ঠানের নির্ধারিত দিনের ঠিক আগের দিন বুধবার স্থানীয় দুই বাসিন্দা দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসির কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়ে গানের আসরটি দ্রুত বন্ধ অথবা স্থগিত করার জোরালো দাবি জানান। গ্রামবাসীর পক্ষে আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু নামের ওই দুই ব্যক্তি স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেন যে, হাতিয়া-রাধানগর গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সুসংহত সামাজিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গ্রামে একটি প্রতিষ্ঠিত আলিম মাদ্রাসা, একজন প্রখ্যাত আল্লাহর ওলির পবিত্র মাজার এবং অসংখ্য আলেম-ওলামার বাস রয়েছে। এমন একটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে প্রকাশ্যে বাউল গানের আয়োজন করা হলে তা সাধারণ বাসিন্দাদের অনুভূতিতে আঘাত হানবে এবং এলাকায় সামাজিক অশান্তি তৈরি করবে বলে আবেদনকারীরা দাবি করেন।
আবেদনকারীদের অভিযোগের প্রধান তিরটি ছিল মূলত নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণের দিকে। তারা অভিযোগে জানান, প্রবাসীদের মাধ্যমে আয়োজিত এই গানের আসরে নারী বাউলদের দিয়ে পরিবেশনার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা তাদের মতে ধর্মীয় অনুশাসন ও স্থানীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী। নারী শিল্পীরা মঞ্চে উঠলে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে সংঘাত, হাঙ্গামা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়। গ্রামটির অতীত ইতিহাসে এমন আয়োজনের কোনো নজির নেই দাবি করে তারা প্রশাসনের কাছে দরখাস্ত জানান, যেন অনতিবিয়োগে সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং কোনো অবস্থাতেই এই আয়োজনটি হতে না দেওয়া হয়।
আবেদনের সত্যতা স্বীকার করে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, স্থানীয়দের লিখিত আপত্তি পাওয়ার পরই তারা সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের আশঙ্কা এড়াতে পুলিশ পুলিশি দায়িত্বের অংশ হিসেবে আয়োজক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পুলিশী মধ্যস্থতা ও আলোচনার পর আয়োজকরা আইন ও সামাজিক পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে গান-বাজনার কর্মসূচি বাতিল করতে সম্মত হন। এর ফলে পুলিশ প্রশাসনের ভাষ্য মতে, বিষয়টি আপাতত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসিত হয়েছে।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাউল গানের ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে আরও স্পষ্ট করেন যে, স্থানীয়দের বিরোধিতা মূলত বাউল সংগীত ধারার বিরুদ্ধে ছিল না। তাদের চরম আপত্তি ছিল প্রধানত নারী শিল্পীদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়দের মনে এক ধরণের অমূলক শঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, নারী শিল্পীদের দিয়ে পরিবেশনা করানো হলে সেখানে পরবর্তীতে অসামাজিক কার্যকলাপ কিংবা শালীনতাবহির্ভূত পরিবেশের সৃষ্টি হতে পারে। সেই সামাজিক ও ধর্মীয় অমূলক আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রশাসন ও আয়োজক পক্ষ যৌথভাবে আসরটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে দিরাইয়ে নারী বা বাউল সংস্কৃতির ওপর এমন বিধিনিষেধ ও বাধার ঘটনা এবারই প্রথম নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। মাত্র কয়েক দিন আগে, চলতি বছরের পাঁচই অক্টোবর দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি বহুল প্রতীক্ষিত প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের কথা ছিল। দিরাইয়ের স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব এবং সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের নারী ফুটবলারদের মধ্যে সেই প্রীতি ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয় একটি রক্ষণশীল পক্ষের চরম বিরোধিতার মুখে তাও শেষ মুহূর্তে পণ্ড হয়ে যায়।
খেলাটির আয়োজক স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও দলীয় কোচ রাকিব আহমেদ ভূঁইয়া আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, ম্যাচের আগের দিন রাতে স্থানীয় চণ্ডীপুর এলাকার মাওলানা শরিফ উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল লোক সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে হাজির হন এবং নারী ফুটবলকে অনৈসলামিক ও অশ্লীলতা আখ্যা দিয়ে তা তাত্ক্ষণিকভাবে বন্ধের জোর দাবি তোলেন। এমনকি ইউএনও কার্যালয় থেকে বের হয়ে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রচার করে তীব্র আন্দোলন ও প্রতিবাদের হুমকি দেন। পরবর্তীতে উদ্ভূত সামাজিক অস্থিরতা এড়াতে এবং প্রশাসনিক নির্দেশে বহু কষ্টার্জিত সেই নারী ফুটবল ম্যাচটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করতে বাধ্য হয় আয়োজকরা।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দিরাইয়েরই উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অবিসংবাদিত বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিম। ২০০৯ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই নিভৃত পল্লীতে বসেই মানবতা, প্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজ সংস্কারের হাজারো মুক্তিকামী গান রচনা করে গেছেন। তবে জীবিতকালেও উগ্রবাদী ও কট্টরপন্থীদের রক্তচক্ষু থেকে বাদ পড়েননি এই কালজয়ী সাধক। তৎকালীন সময়েও তার গান ও সুরসাধনায় ধর্মীয় অজুহাতে নানা বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। আজ করিমের প্রয়াণের বহু বছর পরও তার জন্মভিটায় নারী শিল্পীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া কিংবা নারীদের মুক্ত ক্রীড়া চর্চায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, লোকসংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিরুদ্ধে কট্টরপন্থার এই কালো ছায়া কতটা গভীর ও উদ্বেগজনকভাবে আজও শেকড় গেড়ে রয়েছে।


