প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জের হওর-বাওড় ও বিশাল জলমহালগুলো একসময় দেশীয় মৎস্য সম্পদের সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ প্রযুক্তির আগ্রাসনে আজ সেই ঐতিহ্যবাহী মৎস্যসম্পদ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রাণঘাতী চায়না দুয়ারী জালের (যা রিং জাল নামেও পরিচিত) অনিয়ন্ত্রিত ও অবাধ ব্যবহারে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। সরকারি নিয়মকানুন ও শর্ত মেনে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে জলমহাল ইজারা নেওয়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। বছরের পর বছর প্রশাসনিক দ্বারে দ্বারে ঘুরে এবং লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনো স্থায়ী প্রতিকার না পাওয়ায় কোটি টাকার আর্থিক লোকসানের বোঝা টানতে হচ্ছে আসল ইজারাদারদের, যা তাদের জীবন-জীবিকাকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শান্তিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ভোরে থলেরবন্দ কৈয়া-বনুয়া বিলে গিয়ে পাওয়া যায় এক ভয়াবহ ও হতাশাজনক দৃশ্য। বদ্ধ এই জলমহালে সূর্য ওঠার আগেই একশ্রেণীর অসাধু চক্রের মাধ্যমে শত শত চায়না দুয়ারী, সূক্ষ্ম নেটের বাঁধ ও নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ফেলে অবাধে মাছ নিধনের মহোৎসব চালানো হচ্ছে। সরকারি নিয়ম মেনে ইজারা নেওয়া ‘থলেরবন্দ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সদস্যরা যখন এই বেআইনি কর্মকাণ্ডে বাধা দিতে যান, তখন তাদের জোটে অকথ্য গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি। প্রভাবশালী চক্রের এই সশস্ত্র ভয়ভীতি ও দাপটের কারণে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন এড়াতে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা। ফলে নিজেদের চোখের সামনেই নিজের কষ্টে লালন করা মৎস্যসম্পদ লুটে যেতে দেখলেও নীরবে চোখের জল ফেলা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকছে না।
নথি ও সরকারি তথ্যানুযায়ী, স্মারক নম্বর ১২৯-এর অধীনে ১৪৩০ বাংলা সন থেকে শুরু করে ১৪৩৫ বাংলা সন পর্যন্ত মেয়াদে থলেরবন্দ কৈয়া-বনুয়া বিলটি বৈধভাবে ইজারা পায় ‘থলেরবন্দ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’। ইজারা পাওয়ার পর থেকে প্রতি বছর সমিতিটি সরকারের সমস্ত নিয়মকানুন কঠোরভাবে পালন করে আসছে। বিলটিতে প্রজনন বাড়াতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় পোনা অবমুক্ত করা হয়। মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির স্বার্থে পুরো প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয় এবং বিলের ভেতরে নিজস্ব খরচে একটি অভয়াশ্রম ও একটি উন্নত বিল নার্সারিও গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ তাদের এই নিঃস্বার্থ পরিচর্যার সমস্ত সুফল ভোগ করছে একশ্রেণীর অসাধু মাছ শিকারি। রিং জালের মতো অতি ক্ষতিকর জালের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে বিলের বড় মাছের পাশাপাশি রেণু পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ এবং বিলের জীববৈচিত্র্যের জন্য জরুরি নানা জলজ প্রাণী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী মৎস্যজীবীদের কথা থেকে জানা যায়, এই সংকটের ইতিহাস একেবারেই নতুন নয়; বরং তা বেশ পুরোনো ও দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালেই প্রথম এই অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেবুন নাহার শাম্মী সরজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু রহস্যজনকভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে পার পেয়ে গিয়ে চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও ধারাবাহিকভাবে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে ইজারাদাররা লিখিত আবেদন জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোনো বছরই কার্যকর বা স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৬ বছরেই ইতিমধ্যে দুবার এবং সর্বশেষ গত ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সমিতিটি আবারও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে বাধ্য হয়।
মাঠপর্যায়ের ইজারাদারদের ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাসের গল্প অত্যন্ত মর্মান্তিক। থলেরবন্দ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আমীন চরম আকুতি নিয়ে জানান, অবৈধ রিং জাল ও বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে মাছ কাড়ার কারণে প্রতি বছর তাদের সমিতি অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। গত বছর আগাম বন্যা ও বৃষ্টির কারণে সময়মতো মাছ আহরণ করতে না পেরে সরকারি খাজনার বকেয়া টাকা শোধ করতে তাদের সুদে ঋণ নিতে হয়েছিল। চলতি বছরেও তারা বিলের বিভিন্ন পয়েন্টে মাছ ধরতে গিয়ে অসাধু দখলদারদের বাধার মুখে পড়ছেন। বিলে মাছের বংশ বৃদ্ধি না পাওয়ায় ও মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এবারও সরকারি খাজনা পরিশোধ করা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সব নিয়ম মেনেও প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো সাহায্য না পাওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ মকবুল হোসেনের মতে, কৈয়া ও বনুয়া বিল উন্নয়ন স্কিমে একটি প্রভাবশালী ও সুসংগঠিত চক্র চায়না দুয়ারী, নেট, কারেন্ট জাল এবং কৃত্রিম বাঁধ তৈরি করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাছ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রতি বছর তাদের সমিতির সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দ্রুত এই অবৈধ জাল ও বাঁধ অপসারণ না করা হলে শত শত মৎস্যজীবী পরিবার একদম পথে বসে যাবে। একই ধরনের হতাশা ব্যক্ত করেন সমিতির সদস্য মোহাম্মদ সামির হোসেন। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে চলা এই অবৈধ জালের তাণ্ডবে তাদের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে। থানায় মামলা ও দফায় দফায় অভিযোগ করেও যখন কোনো সমাধান পাওয়া যায় না, তখন সরকারের আইনকানুন ও ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা উঠে যায়।
বিলটির অতীত ও বর্তমানের ব্যবধান তুলে ধরে সমিতির সাবেক সভাপতি আমিরুদ্দিন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, একসময় এই বিলটি পলি জমে প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। তারা বহু শ্রম, অর্থ ও ঘাম ঝরিয়ে বিলটি খনন করে মাছ চাষের উপযোগী করেছিলেন। কিন্তু এখন যখন পরিশ্রমের ফসল হিসেবে মাছগুলো বড় হয়, তখনই একশ্রেণীর দখলদার বাঁধ দিয়ে ও চায়না দুয়ারী ফেলে সব মাছ লুটে নিয়ে যায়। চলতি বছরেই তাদের প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সরকারি দপ্তর ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জুতোর তলা ক্ষয় করলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো সুরাহা মেলেনি।
তবে বারবার অভিযোগ সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শান্তিগঞ্জের বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিল্লোল চাকমা এক ভিন্ন আশ্বাসের কথা জানান। তিনি স্বীকার করেন যে, সমিতির সাম্প্রতিক লিখিত অভিযোগটি তিনি পেয়েছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরূত্বের সঙ্গে তদন্ত করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়া গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বিলে অবৈধ জাল ও বাঁধ ব্যবহারকারী অসাধু চক্রটিকে ইতোমধ্যেই সাত দিনের একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তারা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল সরানো এবং বেআইনি বাঁধ অপসারণ না করে, তবে মোবাইল কোর্ট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে কঠোর আইনি অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।


